Showing posts with label স্মরণ. Show all posts
Showing posts with label স্মরণ. Show all posts

Friday, March 14, 2008

আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন


আজ আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন

আলবার্ট আইনস্টাইন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ। জার্মানীর উলম শহরে। স্কুলজীবনে তিনি খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেননি। পরীক্ষায় পদার্থ ও গণিত ছাড়া অন্যবিষয়গুলোতে টেনেটুনে পাশ করতেন বা কখনও কখনও ফেল করতেন। সেই ফেল করা ছাত্রের জন্য পদার্থবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান আজ নতুন করে লিখতে হয়েছে।

Read More ...

Saturday, March 8, 2008

তিনি আরজ আলি মাতুব্বর

তিনি আরজ আলি মাতুব্বর

সুশান্ত বর্মন

প্রায় ৫০-৬০ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাই প্রথম প্রশ্ন তোলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে? মানুষ কোত্থেকে আসে? বেঁচে থাকে কেন? মারা যায় কেন? শুধু মানুষ নয়। প্রকৃতিকে নিয়েও তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছিল। নদী প্রবহমান কেন? বাতাস কি? পাহাড় এলো কোত্থেকে? সূর্য আলোকিত কেন? সহস্র বছর আগের অবিকশিত ও আদিম বুদ্ধি দিয়ে আদিম মানুষেরা ভেবে নিয়েছিল তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান। প্রাণীজগতের সব প্রাণীই নিজেদের যেকোন সমস্যায় নিজ নিজ বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই আধুনিক যুগেও প্রাণীদের চোখে মটরগাড়ীগুলো শব্দকারক ও দূর্গন্ধযুক্ত একটি বিদঘুটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নয়। একটি যন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণের জন্য আমরা প্রাণীদেরকে দোষ দিতে পারি না। কারণ যন্ত্রকে যন্ত্র মনে করার জন্য যে জ্ঞান, মেধা, মণীষা, অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা তাদের নেই। জীব জগতের কোটি বছরের ইতিহাসে মনুষ্যেতর প্রাণীগুলো কখনো যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেনি, বা করতে চায়নি। বানর, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য কয়েকটি মাত্র প্রাণী অবশ্য যন্ত্রের ব্যবহার করে। উঁচু ডাল থেকে ফল পাড়তে লাঠি, শত্রু তাড়াতে ঢিল, খাদ্য ভাঙতে পাথর ইত্যাদির ব্যবহার তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের যন্ত্র সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা অতটুকু প্রাথমিক অবস্থাতেই থেকে গেছে। আর কোন অগ্রগতি হয়নি এবং তা সহজাত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ যন্ত্রের ঐ সীমিত ব্যবহারটুকুর বেশি তাদের প্রয়োজন হয়নি। তাই যন্ত্রের আবিষ্কার বা উৎকর্ষের জন্যও কোন রকম অভ্যন্তরস্থ আগ্রহ তারা বোধ করেনি। কিন্তু মানুষ মানবেতর নয়। ক্রমাগত নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আগ্রহ মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে মানুষ নিরন্তর তার পূর্বতন অনভিজ্ঞতা, অনগ্রসরতা, পশ্চাৎপদতা, সীমিত যান্ত্রিক শক্তি প্রভৃতিকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাগ্রহে বরণ করেছে ভবিষ্যতের নতুনত্ব, জ্ঞান, আবিষ্কার, মনন। তাই অন্যান্য পশুদের জীবন যাত্রা এখনও আদিম যুগের ন্যায় থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা পাল্টে গেছে। মানুষ এগিয়ে এসেছে বর্তমানের কুসংস্কারহীন প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে।

উপর্যুক্ত আলোচনাটি তত্ত্ব হিসাবে অসাধারণ এবং বাস্তব মনে হলেও এতে একটি ত্রুটি আছে। কারণ মানুষ বিভক্ত বহু ভাগে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতির কাঠামো ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যভেদে মানুষ বিভিন্ন রকম। কেউ পাহাড়বাসী, কেউ সমতলবাসী, কেউ দ্বীপবাসী, কেউবা বনবাসী। কেউ রুক্ষ অঞ্চলে, কেউবা উর্বর ভূমিতে বাস করে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয় মানুষের সার্বিক অগ্রগতির আয়তন। মাটির গঠন, বাতাসের আর্দ্রতা, সূর্যালোকের প্রখরতা, গাছপালার পরিমাণ মানুষের আত্মিক বিকাশ ও নৈতিক মানদণ্ড গঠনে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যে ব্যক্তি বাস করে রুক্ষ্ম ভূমিতে তার তুলনায় বাংলাদেশের ন্যায় উর্বর জলাভূমিতে বসবাসকারী ব্যক্তির মন অনেকাংশে নরম হবেই। অর্থাৎ মানুষের মানসিক পরিবর্তন সারা পৃথিবীতে সমান্তরাল গতিতে অগ্রসর হয়নি। যে ব্যক্তি মরুভূমিতে বাস করে সে পৃথিবী সম্পর্কে যেরকম ধারণা পোষণ করে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা লালন করে উর্বর ভূমিতে বাসকারী মানুষ। যে জনগোষ্ঠী পাহাড়ে বাস করে তাদের ধারণার সাথে দ্বীপবাসীর ধারণার কোন অংশেই মিল নেই। প্রত্যেকে পৃথিবী, প্রাণীজগত এবং মনুষ্যত্বকে বিচার করে ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক অবস্থান থেকে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে জগৎকে বিচার করার ফলেই মানুষে মানুষে এত পার্থক্য। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীও মানুষ বিভিন্ন রকম। এক কালে ধারণা করা হতো মানুষের বুদ্ধিতাত্ত্বিক অগ্রগতি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে সে ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছে।

আমরা বাঙালিরা পৃথিবীর যে অঞ্চলে বাস করি সে অঞ্চলের মাটি খুবই উর্বর। উত্তরের হিমালয়ের পাদদেশ ধুয়ে পলি নিয়ে এসে এই অঞ্চলের নদীগুলো বঙ্গভূমির শরীর তৈরী করেছে। ফলে এখানকার মানুষের খাদ্যের অভাব কখনও হয়নি। প্রকৃতির ভালোবাসায় সিক্ত মানুষেরা ব্যক্তিগত জীবনেও ভালোবাসাপ্রবণ হবার কথা। কিন্তু বর্তমানকালের সামাজিকতা তুলে ধরে বাঙালির আবহমানকালের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তাই বলে বাঙালির বর্তমানের হীন চরিত্রের চিত্র চিরকালের নয়। আজ থেকে হাজার বছর আগেও বাঙালি চরিত্রের সাথে প্রকৃতির চরিত্রের তত অমিল ছিল না। ক্রমাগত পাহাড়বাসী ও মরুভূমিবাসীদের নৈতিক আগ্রাসনের জালে বাঙালি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছে গত হাজার বছরে। নিজ প্রকৃতি সম্ভূত নীতিবোধ একাধিক কারণে বিসর্জন দিয়ে তারা গ্রহণ করেছে পাহাড় ও মরুভূমির উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতিবোধ। ফলে তাদের মানবিক অবস্থানের পতন ঘটতে দেরী হয়নি। যার হলাহল আমরা একালে মর্মে মর্মে গলাধকরণ করছি।

নিকট পশ্চিম ও দূর পশ্চিম প্রভাবিত মানসিকতায় যা কিছু জ্ঞান ও সুন্দর তার উদ্ভব হয়েছে পাশ্চাত্যেই। আজকের আত্মবিমুখ জাতি হিসেবে আমরা তাইই সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করছি। এ ধারণা সমর্থন করলে আমাদের নিজেদের যে দার্শনিক ঐতিহ্য আছে তাকে অস্বীকার করা হয়। কারণ নির্মোহ ইতিহাস চেতনা আমাদেরকে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। দার্শনিক পরাধীনতাই যে পাশ্চাত্যমুখী অবস্থান তৈরী করেছে আজ তা অনেকাংশে স্পষ্ট। তাই এটা অনেকের অজানা যে, পাশ্চাত্যে দর্শন যখন হাটি হাটি পা পা করে শৈশব অতিক্রান্ত করছিল তখন এই ভারতীয় উপমহাদেশে দর্শন চর্চা হয়েছিল যৌবনপ্রাপ্ত। মাওলানা আজাদ বলেছেন- “ভারতীয় দর্শন মানব সভ্যতার অন্যতম গর্বের সম্পদ।”

প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে যে সাহসী ব্যক্তিরা প্রথম প্রতিবাদ করেন সেই মহান দর্শন যোদ্ধাদের একজন হলেন ঋষি বৃহস্পতি। তিনি ছিলেন সেকালের একজন দুঃসাহসী চিন্তানায়ক। প্রকৃত জ্ঞান ও প্রগতির পক্ষে তার অবস্থান ছিল অটল ও দৃঢ়। সাম্রাজ্যবাদী দর্শন ও নীতিবোধের বিরুদ্ধে তিনিই সর্বপ্রথম জোর গলায় প্রতিবাদ জানান। এ অঞ্চলের যুক্তিবাদী ও মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের চিন্তানায়কদের আদিগুরু হচ্ছেন ঋষি বৃহস্পতি। ঋগ্বেদে বৃহস্পতি বলেছেন, ‘বস্তুই চরম সত্তা’। মাধবাচার্য এর ‘সর্বদর্শন সংগ্রহ’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বার্হস্পত্য দর্শনের এই উদ্ধৃতি আছে- “স্বর্গ নেই, মোক্ষ নেই, আত্মা নেই, পরলোক নেই, জাতিধর্ম নেই, কর্মফল নেই। ত্রিবেদ, ত্রিদণ্ড এবং ভস্মলেপন এসব বুদ্ধি ও পৌরুষহীন কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় মাত্র (বুদ্ধি পৌরুষহীনানাং জীবিকা, ধাতৃনির্মাতা)।” এই বার্হস্পত্য দর্শনের প্রধান ভাষ্যকার হিসাবে চার্বাক ঋষি ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ খ্যাত ছিলেন। উপমহাদেশের দর্শন পরিমণ্ডলে চার্বাকের দার্শনিক অবস্থানের পরিচিতি ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের যথার্থ কারণ চার্বাকের মত করে আর কেউ বলতে পারেনি। তাই জনজীবনের আত্মিক গঠনে তার দর্শনের ভূমিকা ছিল প্রবল। একারণেই চার্বাকের দর্শনকে বলা হয় ‘লোকায়ত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে, “প্রত্যক্ষ ছাড়া পরোক্ষ কোন প্রমাণ নেই। শরীর থেকে পৃথক কেন চৈতন্য নেই।” তিনি মনে করেন বস্তুই সব কিছু সৃষ্টির মূলে। তিনি বলেন, “মৃত্তিকা, বায়ু, অগ্নি ও জল, এই চারিতত্ত্বের সমাহারে শরীর সৃষ্টি হয়। দেহাতীত কোন আত্মা নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোন বহিঃশক্তির সহায়তা ছাড়া, এমন কি অদৃষ্টেরও সহায়তা ছাড়া নিজে নিজেই সৃষ্ট হয়।” Ethnic Epic রামায়ণেও আমরা এই বস্তুবাদী দর্শনের চিত্র পাই। বনবাসে যাওয়া রাম ছোটভাই ভরতের অনুরোধেও যখন অযোধ্যায় ফিরে যেতে অস্বীকার করেন তখন তাদের সামনে এসে উপস্থিত হন বস্তুবাদী ঋষি জাবালি। তিনি রামকে উপদেশ দিয়েছিলেন- “চতুর লোকের রচিত শাস্ত্রগ্রন্থে আছে যজ্ঞ কর, দান কর, ত্যাগ কর, তপস্যা কর ইত্যাদি। এর উদ্দেশ্য কেবল জনসাধারণকে বশীভূত করা। অতএব হে রাম, তোমার এই বুদ্ধি হোক যে পরলোক নেই। যা প্রত্যক্ষ তার জন্যই উদ্যেগী হও যা পরোক্ষ তা পরিহার কর।”

বৃহস্পতি, চার্বাক এর পরে আমরা ভারতীয় বস্তুবাদীদের মধ্যে দেখা পাই সাংখ্য মতাবলম্বীদের। তারা মনে করতেন কাজ একান্তভাবেই কারণের পরিণাম। কাজের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারেনা যা কারণের মধ্যে অবশ্যই অস্ফুট বা বীজাকারে বর্তমান নয়। তাই তাদের বিশ্বাস যেহেতু ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না অতএব ঈশ্বর নেই। তারা মনে করেন পৃথিবী সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বর ধারণার প্রয়োজন নেই। কোনো কারণ নিজের পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাজের সৃষ্টি করতে পারে না। তাই অপরিবর্তনীয় ঈশ্বর জগতরূপ কাজের কোনো কারণ হতে পারে না। তবে তাদের ধারণার মধ্যে বহু আত্মা সস্পর্কিত ভাবনারও মিশ্রণ রয়েছে। এই নিরাসক্ত উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় বৌদ্ধ মতের। গৌতম বুদ্ধের এই মতের নাম বৌদ্ধধর্ম হলেও এটি প্রচলিত অর্থে কোনো ধর্ম নয়। এটি একটি মতবাদ যা মানুষের জীবনযাত্রাকে অর্থবহ করতে চায়। মহান গৌতম বুদ্ধও মনে করতেন আত্মা বা ঈশ্বর বা এধরণের কোন অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা বাস্তবে নেই। এমন ভাবনার প্রভাব জৈন ধর্মের মধ্যেও কিঞ্চিত রয়েছে। কবীর, দাদু প্রমুখ সংস্কারকদের মতবাদের মধ্যেও অলৌকিকতার তুলনায় মানবীয়তার স্পর্শ খুবই স্পষ্ট। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় গণ্ডীর বাইরে থেকে লোকায়ত মরমীবাদকে আশ্রয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন লালন ফকির সহ বাউল সম্প্রদায়। ভারতীয় উপমহাদেশীয় বস্তুবাদী দর্শনসঞ্চারী মনোভঙ্গিকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন ডক্টর রাধাকৃষ্ণন, মানবেন্দ্র নাথ রায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ প্রাজ্ঞ দার্শনিকেরা।

প্রথাবিরোধী ধর্মদর্শনের প্রাচীন ধারাবাহিকতার বাংলাদেশী রূপকার হলেন আরজ আলি মাতুব্বর। তিনি মনে করতেন পশু যেমন সামান্য জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে ধর্মবাদী ব্যক্তিগণও তেমনি সামান্য জ্ঞান নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। মেধার বিকাশ, মুক্তচিন্তা, মুক্তজ্ঞান, বিজ্ঞান চেতনা ইত্যাদি মুক্তবৌদ্ধিক মনোভঙ্গির বিপক্ষে ধর্মপ্রবণ ব্যক্তিগণ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। তাই ধর্ম অনেকাংশেই মানুষের মানবিক বিকাশকে সমর্থন করে না; মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, উদারতা, সহানুভূতিশীলতা, মানবিকতা প্রভৃতির প্রসার-প্রচারকে অনেকাংশেই সীমিত করে তোলে। তিনি জানেন সমাজের যথার্থ মুক্তি ঘটে একমাত্র বস্তুবাদী দর্শনের চর্চাতেই। নিজের প্রান্তিক জীবনের সাধারণ কয়েকটি ঘটনাতেই তিনি বুঝে নিয়েছেন তার ও তার সমাজের আচরিত ধর্মের স্বরূপ। ক্রমাগত গ্রন্থ পাঠে বুঝে নিয়েছেন এর কারণাবলী। এই অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাই তিনি অনবরত প্রশ্নবাণে দগ্ধ করেছেন তথাকথিত সমাজপিতা ও তাদের আচরিত-প্রচারিত ধর্ম ও দর্শনকে।

ফিলোসফি শব্দটি এসেছে ‘ফিলোসফিয়া’ শব্দটি থেকে। ফিলোসফি শব্দটির ইংরেজি ভাবার্থ ‘জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ’। সংস্কৃত ‘দর্শন’ শব্দটির আপাত অর্থ ইন্দ্রিয়জ ‘দেখা’। কিন্তু যখন ‘বিদ্যা’ অর্থে প্রযুক্ত হয় তখন আর তা চাক্ষুষ দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না। চোখ দিয়ে দেখার সীমাবদ্ধতা পেড়িয়ে দার্শনিকরা যখন শুধু মন নয় বুদ্ধি ও চিন্তা দিয়েও দেখা শুরু করলেন তখন থেকেই ‘দর্শন’ শব্দটি লাভ করলো নতুন অভীধা। দর্শন ও জিজ্ঞাসা মোটেই পরস্পরবিরোধী নয়। বরং শব্দ ও চেতনাদ্বয় সবসময়ই পরস্পরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করেছে। প্রাজ্ঞ পণ্ডিত আরজ আলি মাতুব্বরও অজস্র জিজ্ঞাসায় প্রতিনিয়ত বিক্ষত হয়েছেন। এলোমেলোভাবে উদয় হওয়া প্রশ্নধারা তাকে অকুল চিন্তা সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছিল। তিনি দেখেছেন তাঁর জীবনে বিরক্তির উদ্রেগ করা একাধিক সমস্যার মূলে ছিল তার সমাজে আচরিত ও প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। স্বধর্মের কারণেই তাকে একাধিকবার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। ১৩৫৮ সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বরিশালের ল ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তবলিগ জামাতের আমির এফ রহমান আরজ আলিকে জামাতভুক্ত হবার প্রস্তাব দেন। তিনি সরলমনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-“ধর্মজগতে এরূপ কতগুলি নীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি এবং ঘটনার বিবরণ প্রচলিত আছে, যাহা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে এবং এগুলি দর্শন ও বিজ্ঞানের সাহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে, এমনকি অনেকক্ষেত্রে বিপরীতও বটে। ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিনটি মতবাদের সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে চিন্তা করিতে যাইয়া আমার মনে কতগুলি প্রশ্নের উদয় হইয়াছে এবং হইতেছে। আমি ঐগুলি সমাধানে অক্ষম হইয়া এক বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপে নিমজ্জিত হইয়া আছি। আপনি আমার প্রশ্নগুলির সুষ্ঠু সমাধানপূর্বক আমাকে সেই বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপ হইতে উদ্ধার করিতে পারিলে আমি আপনার জামাতভুক্ত হইতে পারি।” কিন্তু পশ্চাৎপ্রবণ করিম সাহেব এর উত্তর দিয়েছিলেন আরজ আলিকে গ্রেফতার করে। আরজ আলির প্রশ্নের বিপরীতে ঈশ্বরের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করেননি। আদালত তাঁর প্রশ্নগুলোকে অপরাধ মনে করেনি কিন্তু প্রশ্নগুলির ব্যাখ্যা তৈরী করতে গিয়েই রচিত হয়ে যায় ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থটি। গ্রন্থটি যখন ছাপাখানায় ছিল তখন জনৈক পীরের আদেশ এসেছিল এর ছাপানো বন্ধ করতে এবং যা ছাপা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে ফেলতে। চুয়াত্তরের কোনো এক সময় মাদ্রাসার ছাত্ররা হত্যার উদ্দেশ্যে আরজ আলিকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণের এইসব অপচেষ্টা প্রত্যেকবারই মুক্তবুদ্ধির মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বিফল হয়ে গিয়েছিল। ’৭১ এ স্বাধীনতার পর তিনি এবং তার সুহৃদরা পরম বিস্ময় ও আতংকের সাথে দেখছিলেন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পতাকাবাহী দেশটিতে ক্রমাগত সিরাত ও কিরাত মাহফিলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা সগৌরবে উপস্থিত হয় ইসলামী সম্মেলন সংস্থায়। আরজ আলি বিশ্লেষক মুহম্মদ শামসুল হক এর ভাষায়- “ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় জাতীয় নেতার সগৌরব উপস্থিতি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতায় নতুন মাত্রা যোগ করে বুকের ভেতরটায় কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।”

আরজ আলি দেখেছেন দাবীকৃত শান্তিবাদীরাই তার জীবনে যতো অশান্তির মূল। তাই অমানবিকতা, আক্রমণপ্রবণতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কারপ্রবণতা, ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ এসবের বিরুদ্ধে তার নৈতিক অবস্থান অনেকের তুলনায় অনেক দৃঢ় ছিল। ধর্মপ্রাণ মার মৃত্যুর পর আরজ আলি তার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য পেশাদার ফটোগ্রাফার দ্বারা মৃত মায়ের ছবি তুলিয়েছিলেন। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী প্রাণীর ছবি তোলা মহা অপরাধ। বর্তমান কালের ধর্মবাদী ব্যক্তিরা একথা স্বীকার করতে না চাইলেও আরজ আলির মুরুব্বীরা ভণ্ড হতে চাননি। তাই ছবি তোলার অপরাধে মৃত মায়ের সৎকারে তাকে সহায়তা করেননি। ধর্মীয় নীতিবোধের দিক থেকে সমাজনেতারা কোনো ভুল করেননি। কিন্তু অবুঝ আরজ আলি ধর্মীয় বিধানের কঠোর অর্গল মেনে নিতে পারেননি। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে বুঝে নিতে চেয়েছেন মানবতাকে অপমান করার উৎস ও অনুষঙ্গসমূহকে। চেতনার বন্ধ দরজায় অনবরত আঘাত করে তিনি পরিস্কার করতে চেয়েছেন হাজার বছরে জমে ওঠা প্রতিটি শ্যাওলাকে। তার শ্রম বিফলে যায়নি।

সমকালে নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ইচ্ছা আর নিজস্ব নেই। স্বাধীনতা শব্দটি তার অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন ইচ্ছাকৃত পরাধীন থাকতে চায়। মানুষ মনে করে মানুষ নিজে নিজে স্বাধীন থাকতে পারে না। খারাপ কিছু করে ফেলতে পারে। তাই তারা তাদের সমস্ত স্বাধীনতা বিসর্জন দেয় প্রথা, আইন, রাষ্ট্র, নিয়ম, ধর্ম, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির কাছে। তারা মনে করে একমাত্র কঠোর আচরণ বা শাসনই মানুষকে সৎ হিসাবে তৈরী করে। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়’ কবির এই কথাটি সমকালে অপমানিত হয়। বাস্তবে প্রত্যেকেই আজ স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায়।

প্রতিটি দর্শন ভবিষ্যত সম্পর্কে যা বলে তা মূলত স্বপ্ন। প্রতিটি মতবাদ ভবিষ্যত সম্পর্কে যা ভাবে তা কল্পনা। আমাদের কল্পনাগুলি যে সমাজের স্বপ্ন দেখায় তা যেন কত সুদূর। এই সামাজিক উপলব্ধি আমাদের মতো আরজ আলিকেও প্রতিনিয়ত তাড়িত করতো। তিনি বুঝতে পেরেছেন বর্তমান সামাজিক কাঠামোয় সন্তুষ্ট থাকা চলে না। কারণ সমকালীন সমাজে মানুষ আর মানুষী রূপ ধরে বেঁচে নেই। তারা নির্ধারিত জীবন কাঠামোয় অনবরত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এই আরোপিত যান্ত্রিকতা ভাঙতে হবে। মানুষকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার সত্যিকার জীবনচেতনার সরল অংকটি। তাই তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। সমাজনেতা, ধর্মনেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন অসংখ্য সমস্যার যৌক্তিক সমাধান। ‘আমি কে?’, ‘আমি কি স্বাধীন?’ ‘অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে?’, ‘আল্লাহর রূপ কি?’, ‘ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’, আল্ল¬াহ ন্যায়বান না দয়ালু?’, ‘আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে কি?’, ‘সৃষ্টি যুগের পূর্বে কোন যুগ?’, ‘ঈশ্বর কি দয়াময়?’, ‘জীবসৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?’ ‘পাপ-পূণ্যের ডায়রী কেন?’, ‘পরলোকের সুখ-দুঃখ শারীরিক না আধ্যাত্মিক?’, ‘গোর আজাব কি ন্যায়সঙ্গত?’, ‘ইহকাল ও পরকালে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আল্লাহ মানুষের পরিবর্তন না করিয়া হেদায়েতের ঝঞ্ঝাট পোহান কেন?’, ‘উপাসনার সময় নির্দিষ্ট কেন?’, ‘নাপাক বস্তু কি আল্লাহর কাছেও নাপাক?’, ‘উপাসনায় দিগনির্ণয় কেন?’, ‘মেয়ারাজ কি সত্য না স্বপ্ন?’, ‘ইসলামের সহিত পৌত্তলিকতার সাদৃশ্য কেন?’, ‘জীবহত্যায় পূণ্য কি?’, ‘মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আকাশ কি?’, ‘দিবা-রাত্রির কারণ কি?’, ‘বজ্রপাত হয় কেন?’, ‘রাত্রে সূর্য কোথায় থাকে?’, ‘আদম কি আদি মানব?’, ‘হজরত মুসা সীনয় পর্বতে কি দেখিয়াছিলেন?’, ‘হজরত সোলায়মানের হেকমত না কেরামত?’, ‘যীশু খ্রীস্টের পিতা কে?’, ‘জ্বীন জাতি কোথায়?’, ‘স্ত্রী ত্যাগ ও হিলা প্রথার তাৎপর্য কি?’ ধর্ম ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে এসব প্রশ্ন সহজাত। একজন প্রশ্নপ্রবণ, যুক্তিবাদী, শিক্ষিত, মানবিক ও উদার ব্যক্তির মনে এসব প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সময়, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ আইন মানুষের এইসব সাধারণ কৌতুহলকে কঠোরভাবে দমন করতে চায়। রাষ্ট্র যেন মানুষের মানবিক রূপের চাইতে স্বাধীনতাহীন যান্ত্রিক রূপটিকেই অধিকতর সমর্থন করে। তাই আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। আমাদের দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করা উচিত কোন দর্শন সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়েছে আর কোন দর্শন সচেষ্ট থেকেছে সামাজিক পরিবর্তনকে বিঘ্নিত করতে।

তিনি জানেন সমস্যাটা কোথায়? তাই কিছু সচেতন উপলব্ধিও তাঁর ছিল। যে পশ্চাৎপদ সামাজিক সিদ্ধান্ত তাঁকে বিরক্ত করতো তার প্রতিও তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি বলেছেন- “মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মিটাইতেছে বিজ্ঞান। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণে অমত করেন, তাহা হইলে আকাশের দিকে তাকান, ঘড়ির দিকে নয়। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণ করিতে না চাহেন, তাহা হইলে যানবাহনে বিদেশ সফর ও জামা-কাপড় ত্যাগ করুন এবং কাগজ-কলমের ব্যবহার ও পুস্তক পড়া ত্যাগ করিয়া মুখস্থ শিক্ষা শুরু করুন। ইহার কোনটি করা আপনার পক্ষে সম্ভব? বোধহয় একটিও না। কেননা মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বিজ্ঞানের দান অনস্বীকার্য। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন হইতে শুরু করিয়া দেশলাই ও সুচ সুতা পর্যন্ত সবই বিজ্ঞানের দান। বিজ্ঞানের কোন দান গ্রহণ না করিয়া মানুষের এক মুহূর্তও চলে না। মানুষ বিজ্ঞানের কাছে ঋণী। কিন্তু সমাজে এমন একশ্রেণীর লোক দেখিতে পাওয়া যায়, যাঁহারা হাতে ঘড়ি ও চক্ষে চশমা আঁটিয়া মাইকে বক্তৃতা করেন আর ‘বস্তুবাদ’ বলিয়া বিজ্ঞানকে ঘৃণা ও ‘বস্তুবাদী’ বলিয়া বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞা করেন। অথচ তাঁহারা ভাবিয়া দেখেন না যে, ভাববাদীরা বস্তুবাদীদের পোষ্য। বিজ্ঞান মানুষকে পালন করে। কিন্তু ধর্ম মানুষকে পালন করে না, বরং মানুষ ধর্মকে পালন করে এবং প্রতিপালনও।” তিনি তাঁর ‘অনুমান’ গ্রন্থের ‘রাবণের প্রতিভা’, ‘ফেরাউনের কীর্তি’, ‘ভগবানের মৃত্যু’, ‘আধুনিক দেবতত্ত্ব’, ‘মেরাজ’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ প্রভৃতি প্রবন্ধে অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞানপ্রবণ মন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন আমাদের বিশ্বাসের স্বরূপ। তিনি দেখিয়েছেন আমাদের চিন্তার যৌক্তিক অসারতা। ‘সৃষ্টি রহস্য’ গ্রন্থে মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সারা পৃথিবীতে প্রচলিত একাধিক সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। তিনি বুঝেছেন সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চৈনিক মত, মিশরীয় মত, ফিনিসীয় মত, ব্যাবিলনীয় মত, অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকা-আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের মত, পলিনেশীয় মত, বৈদিক ধর্ম, পার্সি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টিয় ধর্ম, ইসলাম ধর্ম প্রভৃতির মত পরস্পরের চাইতে আলাদা। সেমেটিক ধর্মগুলোর (ইহুদি, খ্রিস্টিয়, ইসলাম) সৃষ্টিতত্ত্ব প্রায় একই হলেও পরবর্তী ধর্মটি পূর্ববর্তীর তুলনায় নিজেরটাই সঠিক বলে ভেবেছে এবং পূববর্তী ধর্ম সম্পর্কে নিন্দামুখী ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। দার্শনিক মতের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কেও তাঁর কৌতুহল ছিল। থেলিস, অ্যানাক্সিমান্ডার, পিথাগোরাস, জেনোফেনস, হিরাক্লিটাস, এরিস্টটল, এম্পিডোকলস, অ্যানাক্সাগোরাস, ডেমক্রিটাস, লিউকিপ্পাস, সক্রেটিস, প্লে¬টো, অ্যারিস্টটল প্রমূখ প্রদত্ত সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধেও তাঁর সচেতন জ্ঞানপিপাসা ছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন তিনি। তারপরও দাবিকৃত শিক্ষিতজনদের চাইতে তিনি অনেক বেশি শিক্ষিত ছিলেন। মননশীলতার অসাধারণ সৌকর্যছটায় আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন যে প্রশ্নধারা তা আজ মহাসত্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিতে অশিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষায়, প্রজ্ঞায়, মননে, বুদ্ধিবৃত্তিতে বাঙালি জাতির উজ্জ্বল এই নক্ষত্রটির নাম আরজ আলি মাতুব্বর। বাংলা ১৩৯২ সালের ৩ পৌষ জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি অর্থকষ্টে ভুগেছেন সারাজীবন। তারপরও গ্রন্থের সংস্পর্শ থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত দূরে থাকেননি। তিনি জন্ম নিয়েছেন বরিশাল শহর থেকে ছয় মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে লামচরি নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় ছিলনা। তাই মুন্সি তাহের আলীর মক্তবে আরজ আলির শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মুন্সি আব্দুল করিম, মুন্সি আফছার উদ্দিন প্রমূখের কাছে কোরানীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাতে আরজ আলির জ্ঞানতৃষ্ণা মেটেনি। অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও আর তাঁর জীবনে ঘটেনি। নিজের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘আজীবন পল্লীবাসী’, পেশায় ‘খাঁটি কৃষক’, জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাঁর ‘সহচর ছিল গরু’। তিনি ছিলেন ‘ইংরেজী ভাষায় অদ্বিতীয় মূর্খ’, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল ‘সেকালের পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী’ পর্যন্ত। সেই তিনিই নিজের ভিতরে লালন করেছেন একটি চিরপ্রজ্জ্বল দীপশিখা যার নাম ‘মুক্তবুদ্ধি’।

একা একাই তিনি অন্যদের ফেলে দেয়া বই, ছেঁড়া কাগজ, বাজারের ঠোঙা পড়ে পড়ে বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে শিখেছেন ভূগোল, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, ব্যাকরণ। ইসলামের গন্ডী পেরিয়ে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, মনসামঙ্গল, মনুসংহিতা পড়েছেন, লাভ করেছেন সনাতন ধর্ম সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান। ক্রমাগত মানসিক দিগন্ত প্রসারিত করার এক অদম্য নেশায় পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তাঁর কৌতুহলী মনের সামনে সব সময়ই একটি প্রশ্ন ‘কেন’ তাকে দাঁড় করিয়েছে এক মহাকালিক সমাধানের সামনে।

মৃত মায়ের ছবি তোলার কারণে যে সময়ে ধর্ম ও সমাজনেতাদের কাছে তিনি অপরাধী সাব্যাস্ত হন সেসময় তিনি স্বপাঠ প্রক্রিয়ায় দশম শ্রেণীর পাঠ্যবই পড়ছিলেন। সমসাময়িক সময়েই তিনি দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, শীত-গ্রীষ্ম, বজ্র-বৃষ্টি, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে করতেই যুক্তিবাদী হয়ে উঠছিলেন। প্রায় প্রতিটি বিষয়েই প্রশ্ন করা এবং তার বিজ্ঞান সম্মত উত্তর খোঁজা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। মৃত মায়ের ফটো তোলা কেন্দ্রিক ঘটনায় তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন দৃষ্টি ফেরালো ধর্মের দিকে। এবার তিনি সচেতনভাবে শুরু করলেন বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থপাঠ। অসংখ্য দার্শনিক প্রশ্ন তাঁকে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিল।

প্রচলিত অর্থে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। কিন্তু অনেক শিক্ষিতজনের চাইতেও তাঁর দৃষ্টি স্বচ্ছ ও গভীর ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানগর্বী আমাদের মননে আঘাত করে অশিক্ষিত(?) আরজ আলি মাতুব্বর দেখিয়ে দিয়েছেন মুক্তবুদ্ধি কিংবা যুক্তিবাদী হওয়ার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী হওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তাই তিনি বুঝেছেন, “শাহ ছাহেবদের ‘কালাম’এর তাবিজে কৃমি পড়ে না, কৃমি পড়ে স্যান্টোনাইন সেবনে। মানত-সিন্নিতে জ্বর ফেরে না, জ্বর ফেরাইতে সেবন করিতে হয় কুইনাইন। লোকে বিশ্বাস করিবে কোনটি? নানাবিধ রোগারোগ্যের জন্য পীরের দরগাহ হইতে হাসপাতালকেই লোকে বিশ্বাস করে বেশি। গর্ভিনীর সন্তান প্রসব যখন অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে, তখন পানিপড়ার চেয়ে লোকে বেবী ক্লিনিকের (Baby Clinic) উপর ভরসা রাখে বেশী।” এই সচেতন অনুভূতির জন্য তাঁকে ভুগতেও হয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণ তাঁকে তাড়া করেছে জীবনভর। তবুও তিনি নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে যা বুঝেছেন তার পক্ষে নিজ অবস্থান অনড় রেখেছেন।

প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা তিনি পাননি। তারপরও তিনি তাঁত, ডায়নামো, জলঘড়ি, জলকল প্রভৃতি যন্ত্র তৈরী করতে পেরেছিলেন। ‘সীজের ফুল’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মনীষা ও প্রজ্ঞার চরম প্রকাশ ঘটেছে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘অনুমান’, ‘আমার জীবন দর্শন’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলিতে। এই গ্রন্থগুলিতেই তিনি কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে এক মৌনবিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। অন্যদের মত চীৎকার করে নয়; তাঁর স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যে, বিনম্র, ধীর, শান্ত ও যুক্তিবাদী ভঙ্গীতে।

তিনি দেখেছেন আমাদের সমাজের মানুষেরা চিন্তায় স্থবির, জিজ্ঞাসাবিমুখ। তাঁরা হাজার বছর অতীতের বৈদেশিক নিয়মনীতিকেই সঠিক মনে করে। স্বদেশী চেতনা, মর্মবোধ, নীতি, সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁরা পোষণ করে এক অজ্ঞ বিমুখতা। এটা যে কুসংস্কার প্রবণতার ফল সে সম্বন্ধে আরজ আলি মাতুব্বরের কোন সন্দেহ ছিল না। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে তিনি বুঝে নিয়েছেন এই সামগ্রিক স্ববিরোধীতার উৎসসমূহ।

প্রচলিত অর্থে তিনি নতুন কোন দার্শনিক তত্ত্বের সৃষ্টি করেননি। কোন মৌলিক তত্ত্ব উদ্ভাবনের চেষ্টাও তিনি করেননি। কিন্তু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিযে দেখিয়ে দিয়েছেন কোন দার্শনিক মতকে কিভাবে গ্রহণ করতে হয়, কোনটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত, কোনটি তুলনামূলকভাবে মানবীয়, কোনটি সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানচেতনাসম্পন্ন। তিনি এ সমাজের অজ্ঞান মানুষদের বৌদ্ধিক পুষ্টির অভাব দূর করতে চেয়েছিলেন। তাই শুধু প্রশ্নই করেননি। প্রশ্নের পাশাপাশি তাঁর প্রশ্ন করার কারণ, পদ্ধতি, বিশ্লেষন ও সমাধানের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি তাঁর সচেতন অর্থাৎ যুক্তিপ্রবণ মন দিয়ে যা দেখেছেন, মনে করেছেন, বুঝেছেন তা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী মতগুলোর তুলনাও করেছেন কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত দেননি। সমস্ত তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরে প্রত্যাশা করেছেন পাঠকের বুদ্ধিপ্রভাবিত আলোকিত চিন্তার। কামনা করেছেন সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণের মর্মদীপ্ত উপলব্ধির।

আরজ আলি মাতুব্বর এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছেন যে সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপ্রবণ, কুসংস্কারমুখী ও বৈদেশিক নীতির আফিমে আচ্ছন্ন। প্রতিভাবিমুখ এ সমাজে তাই আরজ আলিকে আমরা চিনিনা বা চিনলেও তাঁর সম্পর্কে পোষণ করি এক কুসংস্কার প্রভাবিত সংস্কার। মধ্যযুগে ফ্রান্সিস বেকন ইউরোপে জন্ম নিয়ে জন্ম দিয়েছেন আধুনিক যুগের। ইউরোপ তাঁকে রেনেসাঁসের অগ্রদূত বলে সম্মানীত করেছে। পণ্ডিতম্মন্য আমরা আরজ আলিকে না চিনলেও পাশ্চাত্যের আলোকিত সমাজ তাঁকে চিনতে ভুল করেনি। তাই যে সময়ে আরজ আলি তাঁর স্বদেশে প্রায় অজ্ঞাত বা নিষিদ্ধ সেই সময়ে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের ‘Iconoclast’ পত্রিকা লিখেছে Aroj ali, ‘The insurrectionist’, দিয়েছে সক্রেটিসের মর্যাদা।

Read More ...

Thursday, March 6, 2008

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ২

মানুষের কংকাল বিষয়ে হাজার বছরের প্রচলিত বিশ্বাস এর বিপরীতে ভেসালিয়াসের এই আবিষ্কার সারা ইউরোপে দারুণ সাড়া ফেলে দিলো। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় দেয়া বক্তব্যে ভেসালিয়াস সেই অপরাধীর কংকাল আবিষ্কার এর বিষয়টি উল্লেখ করে বলতেন- আমি যদি গভীর রাতে কংকাল দেখে আধিভৌতিকতাকে বিশ্বাস করে ভয় পেতাম তাহলে আজ সত্যকে চিনতে পারতামনা। যদি মহান গ্যালেনকে ধ্রুবসত্য বলে বিশ্বাস করতাম তাহলে আজ জানা হতো না বৈজ্ঞানিক সত্যটি। বন্ধু ক্যালকার এর আঁকা ছবি ও নিজের পর্যবেক্ষণজাত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা উপস্থাপন করে ভেসালিয়াস তাঁর নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তুললেন। নিখুঁত চিত্র ও বিস্তারিত তথ্যে বেশিরভাগ জনগণ নিজেদের বিশ্বাসের সাথে বৈজ্ঞানিক সত্যের পার্থক্য বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা নিজেদেরকে বোকা ভাবতে চাইলেন না। তাই বাড়িতে ঢিল, রাস্তায় হুমকী, মারধর ইত্যাদি সহিংস পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ভেসালিয়াসকে বিরক্ত করতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে ভেসালিয়াস প্যারিস ছেড়ে ইটালিতে চলে এলেন। ইটালির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে ইটালি অনেকটা উদার ও সহনশীল সমাজ তৈরি করতে পেরেছিলো। রক্ষণশীলতার বন্ধ কপাট ইটালিতে অনেকাংশেই খোলা ছিলো। সেখানকার কর্তৃপক্ষ প্রাচীন পুস্তককেই একমাত্র সত্যি কথা বলে বিশ্বাস করতে নারাজ ছিলেন বলেই মেধাবী গবেষকদের কাছে ইটালি দেশটির একটি আলাদা মর্যাদা ছিলো। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমির অধ্যাপক পদে ভেসালিয়াস নিযুক্ত হন মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে, ১৫৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে।
ভেসালিয়াস বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এভাবে চিরকাল বক্তৃব্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই যদি একটি বই লেখা যেতো তাহলে খুব ভালো হতো। পাদুয়ায় শিক্ষকতা ও গবেষণার আঁকে ফাঁকে কয়েক বছরের নিরলস চেষ্টার পর একটি গ্রন্থ লেখা সম্পূর্ণ করলেন। সমকালীন নীতিবাদীদের অনেক বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে প্রকাশিত হওয়া গ্রন্থটির নাম- ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’। বাংলায় ‘মানব দেহের অঙ্গসংস্থান’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি একটি বিশাল স্থান গ্রহণ করে আছে। মানব শরীরের অভ্যন্তরস্থ প্রত্যঙ্গগুলো সম্পর্কে এটাই প্রথম যথাযথ বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ। মানুষের হাড়, মাংশপেশী, প্রত্যঙ্গের গঠন, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সম্পর্কে নিখুঁত আলোচনা ও বন্ধু ক্যালকার-এর আঁকা চিত্র প্রাচীন বিজ্ঞানের অনেক মীথ ভেঙে ফেলেছে। তাঁর আলোচনা পদ্ধতি ছিলো সরল ও প্রাণবন্ত। তাঁর বর্ণনাপদ্ধতি এখনও আধুনিক শারীরবিদদের পথ প্রদর্শন করে চলেছে। হাড়, পেশী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও ক্যালকার এর আঁকা প্রামাণ্য চিত্র দিয়ে ভেসালিয়াস গ্যালেনপন্থীদের অবস্থান দূর্বল করে দিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ভেসালিয়াসের কীর্তিতে সমৃদ্ধ হলেও কতিপয় ব্যক্তিবর্গের মন তুষ্ট হয়নি। ভেসালিয়াস তাঁর ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটি প্রকাশের কাজ তদারক করতে একদিন ইটালি ছেড়ে বেলজিয়ামে যান। প্রিয় ও মেধাবী ছাত্রটিকে তাঁর অবর্তমানে কাজ চালিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। কয়েক দিন পর ফিরে এসে দেখেন তাঁর প্রিয় ছাত্রটি কূটবুদ্ধি ও গ্যালেনপন্থীদের সাথে ভালো যোগাযোগের সুযোগে নিজ অবস্থান পাকা করেছে। ছাত্রটি তাঁর মেধাবী কর্মকৌশলে ভেসালিয়াসকে সরিয়ে নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেবার কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেসালিয়াসের সাথে কোন কথা বললেন না; তাঁর দেয়া কোন যুক্তিকেই তাঁরা বহন করলেন না। অপমানিত ভেসালিয়াস দারুণ লজ্জায় নিজেকেও গুটিয়ে নিলেন। তাঁর এতদিনের গবেষণা-পড়াশোনা নিজের কাছেই ভুল বলে মনে হতে লাগলো। যে মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর এত চেষ্টা তার কোন মূল্যই চারপাশের মানুষরা গ্রহণ করতে পারছে না দেখে তিনি প্রচণ্ড হতাশা বোধ করলেন। আসলে ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি তাঁর সমকালের তুলনায় অনেক অগ্রগামী চিন্তার মানুষ ছিলেন। হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য অযথা আর চিন্তা করবেন না। সম্রাট চার্লস এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নতুন কাজে যোগ দিলেন। এতদিনের দরিদ্রতা নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। রাজার সংস্পর্শে এসে মুহূর্তেই তার অনেক টাকা উপার্জিত হয়ে গেল। ফ্রান্সের সবচেয়ে অভিজাত ব্যক্তিবর্গের মাঝে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফ্রান্সের বেশ খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। বর্ণাঢ্য জীবন আর মোহনীয় নারীদের মাঝে সারাক্ষণ বাস করলেও ভেসালিয়াসের মন পড়ে থাকতো পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। কিন্তু ফিরে যাবার পরিবেশ ছিলো না আর। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই তিনি হাস্যপ্রিয় নারীদের কোলাহলে মিশে যেতেন। সমাজনেতা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূর্খতার প্রভাবে এভাবেই একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অপমৃত্যু হলো।
বিশ বছর পরে পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক গাব্রিয়েল ফেলোপিয়াস বুঝতে পারেন মানব শরীর বিষয়ক সত্য তথ্যটি। তিনি গ্যালেনের তথ্যের অসারতা ও ভেসালিয়াসের যথার্থতা প্রমান করে ও ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটির প্রভূত প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। একটি চিকিৎসা বিষয়ক ম্যাগাজিনে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। সবাই নতুন করে ভেসালিয়াসকে বিচার করতে চাইলেন। তরুণ ডাক্তাররা সবাই আধুনিক ও কুসংস্কারমুক্ত মনের ছিলো। তারা অনেকেই নিজে নিজে গোপনে পরীক্ষা করে দেখে গ্যালেনের দেয়া ভুল তথ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলো। প্রশাসন ও নীতিবাদীদের নির্যাতনের ভয়ে এতকাল চুপ থাকলেও এখন তারা কোন বাধা মানলো না। অপেক্ষাকৃত মুক্ত মনের নতুন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্বতনদের সিদ্ধান্তের অসারতা বুঝতে পারলেন। তাঁরা ভেসালিয়াসকে পূর্বপদে পুনর্বহাল করে চিঠি দিলে তিনি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। মূর্খ প্রবীণদের ভুল তরুণরা বুঝতে ও সংশোধন করতে চাইছে জেনে তিনি আশান্বিত হন। ফিরে আসতে চাইলেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আসার পথে এক শক্তিশালী ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে তিনি সহ জাহাজের সমস্তু যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। অনেক খোঁজাখুজি করেও জাহাজের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর তীর্থযাত্রীদের একটি জাহাজ সামুদ্রিক ঝড়ে দিকবিভ্রান্তির ফলে চলে আসে ‘জান্তে’ নামক একটি দ্বীপে। ঝড় থামলে তীর্থযাত্রীদের সবাই দ্বীপের বালুতটে একটি জাহাজের ভগ্নাংশ ও বেশ কয়েকটি কংকাল দেখতে পেলেন। সবাই একটি লাশের পাশে দেখলেন ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ নামক গ্রন্থটি। তাদের মধ্যে কারও কারও গ্রন্থটি পড়া ছিলো। তারা উপকূল থেকে একটু উচু জায়গায় ভেসালিয়াসের কংকালটি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখলেন। একটি কাঠে তাঁর নাম লিখে মাথার কাছে পুঁতে রাখলেন।
এক তরুণ বিজ্ঞানসচেতন ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী বিজ্ঞানী ভেসালিয়াস তাঁর চারপাশের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের চাইতে এক পা এগিয়ে ছিলেন। সময়ের চাইতে অগ্রগামী এই ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞাকে তাই তাঁর সমাজের নেতারা বুঝে উঠতে পারেননি। এখনকার মতো সেকালেও সব সামাজিক নেতারা জনগণকে নিজেদের চাইতে মূর্খ ভাবতেন। তাই ভেসালিয়াসের প্রজ্ঞাকে তাঁরা মাপতে পারেননি। বুঝতে পারেননি এই অমর চিকিৎসাবিজ্ঞানীর যাথার্থ। কিন্তু সত্য তথ্য যা তা কখনও চাপা থাকেনি। কুসংস্কারবাদী শক্তিমানদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বিফল প্রমাণিত করে আমরা নিজেরাও আজ জানি যে মানুষের হাঁড়ের বিন্যাস, পেশী সংস্থান, বিভিন্ন অঙ্গের গঠনের সাথে কুকুর-শুকরের হাঁড় বিন্যাস, পেশী সংস্থান বা বিভিন্ন অঙ্গের গঠন বা কার্যাবলীর কোন মিলই নেই। এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশ্বাসকে আঘাত করে করুক তাতে সত্য বসে থাকেনি। বিশ্বাসবাদী গ্যালেনপন্থীরাই যে ভুল ছিলো তা আজ আর কোন ভীততথ্য নয়। এখন শিশুরাও জানে যে নারী-পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই; কারও কোন বিশেষ হাঁড়ও বিকৃত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতদিন বিজ্ঞান সম্মত থাকবে, যদি চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনো বিশ্বাস নির্ভরতার পাতা ফাঁদে পা না দেয় তাহলে চিরকাল প্রশংসার সাথে স্মরণ করবে ‘আধুনিক এনাটমী শাস্ত্রের জনক’ ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস এর অমর কীর্তিকে।
Read More ...

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ১

ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস

সুশান্ত বর্মন

বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান। যা অন্যসব জ্ঞানের মতো নয়। যে জ্ঞান আমাদেরকে এগিয়ে দেয়। মনের কঠিন অন্ধকার দূর করে, দিগন্ত আলোকিত করে। আমাদের মুখোমুখি করে দারুণ সত্যের। আমাদের শতচর্চিত ধারণা বা বিশ্বাসগুলো ভয় পায় বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের সগৌরব যাত্রাপথে নানা বিঘ্ন ঘটাতে চায় এবং ঘটায়। তবুও বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। নানা আক্রমণের মুখেও মহাকাশবিদ্যা, জীববিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের একাধিক শাখা সমাজের মূর্খ নেতাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করেছে। সত্য প্রকাশের দায়ে নির্যাতিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সক্রেটিস, ব্রুনো প্রমুখের নাম চিরস্মরণীয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চাইতে সামাজিক নীতির হাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। কখনও কখনও বিজ্ঞান ও ধর্ম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। কখনও একটি অসাধারণ তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে হঠাৎ করে এসে গেছে, কখনও কোন একটি জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে অভাবিতভাবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনি অনেক ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিজ্ঞান যে কখনও কোন পুরনোবাদীর ইচ্ছার কাছে থেমে থাকেনি এইসব ঘটনার কাছ থেকে আমরা তাই শিখে নেই।

ব্রাসেলস এর এক সম্ভ্রান্ত ফ্লেমিশ বংশে আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার রূপকার ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস ১৫১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রাসেলস এর স্কুল, লোভেন এর কলেজ ও প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তাঁর সময়কালের সমাজের নৈতিক কাঠামো কেমন ছিল ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয় শতকে গ্রীসে জন্মেছিলেন গ্যালেন নামক একজন প্রভাবশালী চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব। অনেক সুখ্যাতি ছিলো তাঁর। তিনি তাঁর একটি বইতে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন যে- কুকুর, শুকর, ছাগল, খরগোশের সাথে মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন- সজ্জাপদ্ধতি, সংখ্যা একই রকম। গ্যালেনের এমন মন্তব্যের কথা জেনে অনেকের হাসি আসতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এখনও এদেশে অনেকে মনে করে দুজনে মানুষ হলেও নারীর ও পুরুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা সমান নয়। উদারবাদী বলে পরিচিত উচ্চশিক্ষিত অনেকে মনে করেন কথাটা সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক সত্যি অর্থাৎ নারী এবং পুরুষ পরস্পরের মধ্যে কোন এক জনের একটি বিশেষ হাড়ের আকৃতিতে নাকি পার্থক্য আছে। মহান গ্যালেনের ধারণাকে সত্য মনে করে নিয়ে ডাক্তারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে এ্যানাটমি শেখাতেন। কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোস, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীর ব্যবচ্ছেদ করে ছাত্রদেরকে মানুষের শরীরের অঙ্গ সংস্থান বোঝাতেন। সেকালের কুসংস্কার এতো প্রবল ছিলো যে মৃত মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করা নৈতিক দিক থেকে মহাঅপরাধ বলে বিবেচনা করা হতো। অর্থাৎ গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখানো হতো যে মানুষের শরীরের হাড়ের সংস্থানের সাথে কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোশ, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীরের হাড়ের গঠন-সন্নিবেশ ও প্রত্যঙ্গ সজ্জার কোন অমিল নেই।
১৫৩৩ সালের শরৎকালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলজিয়াম থেকে একটি নতুন ছাত্র আসে। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নামডাকওয়ালা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ডাক্তারী শেখার জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। সেখানকার এনাটমী শিক্ষা গ্যালেন প্রভাবেব বাইরে নয়, তবুও শুধু নামের কারণেই ছাত্র সংখ্যার কোন কমতি ছিল না। বেলজিয়াম থেকে আসা ছাত্রটির নাম ভেসালিয়াস। তিনি এনাটমীর ক্লাশে শুকর-কুকুরের ব্যবচ্ছেদ দেখতে দেখতেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেনÑ গ্যালেনের বক্তব্যে নিশ্চয় ভুল আছে। হাজার বছর ধরে প্রচলিত বিশ্বাস এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ভেসালিয়াসের ছিলো। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ এখনও তাঁর সংগ্রহ করা হয়নি। তাই তিনি প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এর মধ্যে একদিন তিনি তাঁর এই ধারণার কথাটা প্রকাশ করলেন। বন্ধুরা কেউ কেউ হেসেছিলো, কেউবা পাগল বলে ব্যঙ্গ করেছিলো। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা প্রচন্ড খেপে গেলেন। ভেসালিয়াসকে মিথ্যাবাদী, পাগল, পাপী ইত্যাদি বলে বেড়াতে লাগলেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শারীরিক আঘাতের হুমকীও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভেসালিয়াস বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতেন। তাই পরাজয় স্বীকার করেননি। অপেক্ষা করছিলেন একটি যথার্থ প্রমাণের। সম্পূর্ণ মানব কংকাল হলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু লাশ ব্যবচ্ছেদ করা সামাজিক আইন অনুযায়ী অনৈতিক ও অন্যায়। তা অপরাধ বলে শাস্তিযোগ্য। তাই সেদিকে যাওয়া ভেসালিয়াসের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। অভাবিতভাবেই একদিন হঠাৎ করে তিনি একটি সম্পূর্ণ কংকাল পেয়ে গেলেন। সেকালে সমস্ত ইউরোপে ফাঁসীতে আসামীদের হত্যা করা একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি ছিলো। শহরের বাইরে এক নির্জন পাহাড়ী এলাকায় আসামীদেরকে ফাঁসী দেয়া হতো। ভেসালিয়াস একদিন বৈকালিক ভ্রমণ করতে করতে চিন্তামগ্ন অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশে ফাঁসী দেয়ার জায়গাটায় চলে এলেন। দেখলেন দুই এক মাস আগে ফাঁসী দেয়া এক আসামীর শুকনো কংকালটি ফাঁসী মঞ্চের পাটাতনে পড়ে আছে। লোকজনের চোখ এড়িয়ে কয়েকরাত ধরে বহন করে তিনি সম্পূর্ণ কংকালটি নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। জীবনে কখনো মানুষের কংকাল না দেখা ভেসালিয়াস একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ শুরু করে দিলেন। অনেক পরিশ্রম করে হাড়গুলো ধাতব তার দিয়ে জোড়া দিয়ে একটি সম্পূর্ণ মানব কংকাল সাজিয়ে ফেললেন। সম্পূর্ণ সাজানো কংকালটির দিকে তাকিয়ে ভেসালিয়াস বুঝে ফেললেন এতদিন যা শিখেছেন তা মোটেও সত্য নয়। এতকালের ধারণা-বিশ্বাস, শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতি, সামাজিক সমর্থন সবগুলোই মানুষের হাড়সজ্জা বিষয়ে সম্পূর্ণ কল্পনাশ্রয়ী ও অপপ্রচার মাত্র। মানুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা, গঠন ও সন্নিবেশ পদ্ধতির সঙ্গে গ্যালেন বর্ণিত কুকুর-শিয়াল প্রভৃতি প্রাণীর হাড় সংস্থানের কোন মিল নেই। সামাজিক চাপ এতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও হিংস্র ছিলো যে গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে ভেসালিয়াস পর্যন্ত জন্ম নেয়া অসংখ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী এই সাধারণ তথ্যটুকুই এতদিন আবিষ্কার করতে পারেননি। ভেসালিয়াসের অমর আবিষ্কারের কারণেই আমরা জানি মানুষের হাড়ের চাইতে পশুর হাড়ের সজ্জার যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে, জানি নারী ও পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই। উভয়েরই ২০৬টি করে হাড় রয়েছে। এমনকি দুজনের কোন একটি বিশেষ হাড়েও কোন বিকৃতি নেই।
Read More ...

Monday, March 3, 2008

ম্যালেরিয়া আবিষ্কারের কাহিনী

ম্যালেরিয়া আবিষ্কারের কাহিনী
সুশান্ত বর্মন

পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ানক প্রাণীটির নাম জানতে চাইলে অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে দেবেন। কেউ বলবেন বাঘের কথা, কেউ বা বলবেন ডাইনোসরের কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই ভয়ংকর প্রাণীটির নাম মশা। প্রাণী হিসেবে এটি খুবই ক্ষুদ্র; কিন্তু কাজে কর্মে প্রচন্ড ভয়ানক। ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধক বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হবার পূর্ব পর্যন্ত কত লোক যে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া বোধহয় কখনও সম্ভব হবে না। তবে এই উপমহাদেশে ইংরেজ আমলের এক বছরের হিসেবে দেখা যায় সে বছর মোট ১৩ লক্ষ লোক মারা গেছে এই ছোট প্রাণীটির আক্রমণে। প্রাচীন মানুষ যারা জ্ঞানে অল্প, বুদ্ধিতে হীন, অলৌকিকতায় বিশ্বাসী, নিয়তিবাদী তারা মশার হিংস্র আক্রমণে এতই বিপর্যস্ত ছিলো যে তাকে নিয়ে অসংখ্য গল্প রচনা করেছে। কোন কোন গল্পে দেখানো হয়েছে ছোট মশাটি হাতীর শুঁড় দিয়ে মগজে ঢুকে তাকে আঁচড়ে কামড়ে পাগল করে দিয়েছিলো। শারীরবিদ্যা না জানা ব্যক্তিদের পক্ষে এমন কথা ভাবাই সম্ভব যে নাক দিয়ে ঢুকে মগজে যাওয়া যায় না; কিন্তু এ ধরণের বিভিন্ন গল্প মূলতঃ মশার কর্মক্ষমতার সামনে মানুষের অসহায়তাকেই তুলে ধরে। মশার রক্তলোলুপ ক্ষমতার বিপরীতে অসহায় মানুষ এমন গল্পের সৃষ্টি করে সান্তনা পেতে পারে বৈকী; কিন্তু তাতে বাস্তব অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়না।
মধ্যযুগে ইউরোপে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ব্যাপক ছিলো। সেসময়ও ম্যালেরিয়া নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছিল কিন্তু বিশ্বাসবাদী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যা হয়; মশা সম্পর্কিত গবেষণাও তার বাইরে থাকেনি। বৈজ্ঞানিক নামের এক দল অনেক গবেষণা করে আবিষ্কার করলেন যে ম্যালেরিয়া রোগ হয় দূষিত বাতাস থেকে। তারা লক্ষ করলেন পঁচা ডোবা-পুকুর-নালা-জলাশয়-ঘিঞ্জি ঘর, স্যাঁতস্যাতে জায়গা ইত্যাদির পাশে বসবাসকারী ব্যক্তিরা এই রোগের সহজ শিকারে পরিণত হয়। তাই তারা ভাবলেন পঁচা জল থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস জাতীয় অসুস্থ্যতার মূল কারণ। এই মহা গবেষণা শেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন দূষিত বাতাসের কারণেই এই রোগ হয়। তাই তার নাম রাখলেন ‘ম্যালেরিয়া’ যার অর্থ ‘দূষিত বাতাস’।
১৮৮০ সাল। আলজিরিয়ার হাসপাতালে কাজ করেন লাভারেন নামের এক ফরাসী ডাক্তার। সে সময় আলজিরিয়াতে ম্যালেরিয়াতে প্রতিবছর হাজার হাজার লোক মারা যেতো। একদিন অনুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে কাজ করতে করতে কৌতুহলবশতঃ কয়েকজন ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত স্লাইডে নিলেন। অনুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ দিয়ে দেখতে পেলেন রক্তের মধ্যে কালো কালো অসংখ্য দানা দেখা যাচ্ছে। তিনি ভালো রক্তের সাথে তুলনা করে বুঝতে পারলেন এরাই ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু। তিনি এর সাথে মশার সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা ভাবলেন। তিনি ধারণা করলেন কোনভাবে হোক মশার দেহে এই জীবাণগুলো ঢোকে। তবে এ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারলেন না। কোন জাতের মশা এ ধরণের জীবাণুর বাহক; জীবাণুগুলো কিভাবে মশার শরীরে ঢোকে অথবা কিভাবেই বা মশাবাহী জীবাণুগুলো এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির শরীরে সংক্রামিত হয় সে বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য বা দিকনির্দেশনা দিতে পারলেন না। তিনি এই জীবাণুদের নাম রাখলেন ‘ম্যালেরিয়াল প্যারাসাইট’।
লাভারেন এর আবিষ্কারের কথা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে চারিদিকে সাড়া পড়ে গেলো। তার বক্তব্যকে ভিত্তি ধরে অনেকে গবেষণা শুরু করে দিলেন। এর মধ্যে ম্যানসন নামের এক ইংরেজ ডাক্তার এক নতুন কথা বললেন। তিনি জানালেন- যে ধরণের মশা জীবাণ বহন করে তারা আসলে ‘বিষাক্ত মশা’(?)। এই বিষাক্ত(?) মশারা যদি খাবার জল বা কোন খোলা খাদ্যে বসে তাহলে সেই খাবারটি বিষাক্ত হয়ে যায়। এমন বিষাক্ত খাবার যদি কোন সুস্থ্য ব্যক্তি গ্রহণ করে তাহলে তার শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণ প্রবেশ করে এবং সেও ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়। অভূতপূর্ব এই গবেষণা কর্মটির ফলে যে সিদ্ধান্ত বের হয়ে এলো তার নাম ‘দূষিত জল মতবাদ’। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বিশ্বাসের প্রতি প্রবল বিশ্বাস, পশ্চাৎপদতা ইত্যাদির প্রভাব মানবজীবনে কম নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে আমরা এর বাস্তব প্রমান খুব কাছাকাছি থেকে দেখি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাসে এরকম অজ্ঞতা ও বুদ্ধিহীনতার প্রমাণ মোটেই কম নয়। যুগে যুগে কালে কালে বিজ্ঞান নামের এমন অপবৈজ্ঞানিক চর্চার ধারা আজও থেমে থাকেনি। ম্যানসনের এই অসাধারণ আবিষ্কারের ফলে ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য জানা হয়ে গেছে বলে মনে করা হলো। ফলে নতুন কোন তথ্য আর আবিষ্কার হলো না।
ভারতীয় উপমহাদেশে তখন ইংরেজ শাসন চলছিলো। ভারতের হায়দ্রাবাদ রাজ্যের সেকেন্দ্রাবাদ শহরের এক ছোট হাসপাতালে কাজ করতেন সেনাবাহিনীর তরুণ ইংরেজ ডাক্তার মেজর রোনাল্ড রস। ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন। সমস্ত ছুটির সময়টা তিনি লন্ডনেই কাটাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। একদিন তিন দেখা করতে গেলেন ডা: ম্যানসনের কাছে। তিনি ডা: রসকে ডা: লাভারেন এর কথা জানালেন। বললেন তার নিজের ধারণার কথা। ডা: রসকে উৎসাহিত করে বললেন -‘ভারতবর্ষে ম্যালেরিয়া একটি অন্যতম সমস্যা। প্রত্যেক বছর সেখানে হাজার হাজার লোক ম্যালেরিয়ায় ভুগে মারা যায়। সেখানেই এ বিষয়ে গবেষণা করার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। তোমার গবেষণার প্রত্যক্ষ সুফল তাদেরই পাওয়ার অধিকার প্রথমে রয়েছে।’ ডা: রস ডা: ম্যানসনের কথা শুনে খুবই আশান্বিত হলেন। তিনি ভারতবর্ষের ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত সমস্যাটি জানেন। তিনি এটাও জানেন ভারতে কাজ করতে আসা প্রায় প্রত্যেক ডাক্তার এই নিয়ে গবেষণা করেছেন ও করছেন। অনেক রকমের অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষাও গবেষকরা করেছেন কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ম্যালেরিয়ায় মৃত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছিলো। পূর্ববর্তী গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে হাতে ছিলো শুধু কুইনাইন। কিন্তু তাও ততোটা কার্যকরী ছিলোনা। তাই কুইনাইন দিয়ে রোগীকে সাময়িকভাবে সুস্থ্য করাই শুধু যেতো। তাছাড়া গবেষকরাও নিশ্চিত ছিলেন না এই রোগের পিছনে মশার ভূমিকা কতটুকু আছে তা নিয়ে। কারণ কেউ নিশ্চিত করে জানতো না এ রোগের উৎপত্তি কোথায়; কেমন করেই বা তা একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের এই মহাকালিক অজ্ঞতার কারণে সারা পৃথিবীসহ সেকালে ভারতবাসীকে এক অন্তহীন আতংককে সাথে নিয়ে দিন কাটাতে হতো।
ছুটি শেষে ভারতে আসতে আসতেই ডা: রস তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ঠিক করে ফেললেন। জাহাজের ডেকে বসে বসে স্থির করে ফেললেন ম্যালেরিয়ার রহস্য তাকে ভেদ করতেই হবে। নতুন উদ্যমে ভারতে ফিরে এসে ডা: রস তার সেকেন্দ্রবাদের কর্মস্থলে য়োগ দিলেন। প্রথমে প্রতিদিন মশা ধরে আনার জন্য বেতনের ভিত্তিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে ঠিক করলেন। এদের নাম দিলেন ‘মসকুইটোম্যান’। তিনি ভেবেছিলেন ধরে আনা মশাগুলোকে দিয়ে ম্যালেরিয়াল প্যারাসাইট ভর্তি রক্ত গ্রহণ করাতে হবে। যদিমশাই ম্যালেরিয়া রোগের বাহক হয় তাহলে তাদের পেটে নিশ্চয় এই জীবাণুগুলোকে জীবন্ত পাওয়া যাবে। ভাবামাত্র ডা: রস কাজ শুরু করে দিলেন। একটি বন্ধ ঘরে একজন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে রেখে সেখানে কতগুলো মশা ছেড়ে দেয়া হলো। বেশ কিছুক্ষণ পর মশাগুলোকে আবার ধরে তিনি গবেষণাগারে নিয়ে এলেন। এরপর মশাগুলোর দেহ ব্যবচ্ছেদ করে তিনি অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। মাসের পর মাস ধরে তিনি এই অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। কিন্তু কোন ফল হলো না। তার এতদিনের পরিশ্রম যেন বিফল হযে যেতে লাগলো। তাই বলে তিনি নিরাশ হলেন না। কারণ মশা থেকেই যে এই রোগটা ছড়ায় এটা বৈজ্ঞানিকভাবে এতোদিনে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব মশার মাঝেই খুজতে হবে এর উৎস ও জীবন প্রবাহ। তিনি ভাবলেন হয়তো কোন পদ্ধতিগত ভুল হচ্ছে। তাই তিনি ভিন্ন পদ্ধতিতে এগোবার চেষ্টা করলেন। তিনি এবার নিজস্ব পদ্ধতি ছেড়ে ম্যানসনের দেয়া মতবাদ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। ম্যানসনের ‘দূষিত জল’ মতবাদ মাথায় রেখে তিনি একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করলেন। প্রথমে একটি কাঁচের বোতলে কিছু জল নিলেন। ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত গ্রহণ করেছে এমন কয়েকটি মশাকে সেখানে ছেড়ে দিলেন। এরপর বোতলটি একটি নিরাপদ স্যাঁতস্যাতে অন্ধকার জায়গায় রাখলেন। ৫/৬ দিন পর বোতলটিকে বের করলে দেখা গেল মশাগুলি সব মারা গেছে। কিন্তু কয়েকটি মশার লার্ভা জলের উপর ভাসছে। ডা: রস বুঝতে পারলেন আগের মশাগুলি এই জলের মধ্যে ডিম পেড়েছিলো। সেই ডিম ফুটেই লার্ভাগুলি বের হয়েছে। ম্যানসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বোতলের জলগুলো এখন দূষিত। অনেক টাকার বিনিময়ে ডা: রস সেই বোতলের জল কয়েকজন ব্যক্তিকে খাওয়ালেন। বেশ কিছুদিন কাটলো কিন্তু ‘দূষিত জল’ পান করা ব্যক্তিরা পূর্ববৎ সুস্থ্যই রইলো। কারও মধ্যে অসুস্থ্যতার সামান্য লক্ষণও দেখা গেলো না।
ডা: রস বুঝতে পারলেন না সমস্যাটা কোথায়। তবে এটা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ম্যানসনের বহুল প্রচারিত, প্রশংসিত ও সমর্থিত ‘দূষিত জল’ মতবাদটি মোটেও সঠিক নয়। পরপর এরকম ব্যর্থতার পরও তাঁর গবেষণা কর্মে কোন ভাটা পড়েনি। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের আইপিসে চোখ লাগিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে ব্যবচ্ছেদ কৃত মশার লাশ তিনি পরীক্ষা করেই যাচ্ছিলেন। মশার শরীরের গভীরে চোখ রেখে একদিন ভাবলেন জাত অনুযায়ী রক্ত বিচারের কথা। এবার তিনি আশার আলো দেখলেন। সমসাময়িক সময়েই মসকুইটোম্যানরা কয়েকটি নতুন বৈশিষ্ট্যের মশা ধরে নিয়ে এলেন। এগুলো স্ত্রী জাতীয় এনোফিলিস মশা। পাখার উপর বাদামী রঙের কয়েকটি দাগ দেখে সহজে চেনা যা। তিনি এই এনোফিলিস জাতের মশাগুলোকে এর আগে কখনো পরীক্ষা করেননি। এই নতুন আনা মশাগুলোকে তিনি ম্যালেরিয়া রোগীর ঘরে ছেড়ে দিলেন। এই নতুন জাতের মশার দলটির পেটেই তিনি খুঁজে পেলেন ম্যালেরিয়ার জীবাণু। তার এতোদিনের প্রচেষ্টা সফল হলো। তিনি বিভিন্নভাবে জীবাণুগুলোকে পরীক্ষা করলেন। কয়েকটা পাখিকে কামড়াতে দিলেন। পাখিদেরও ম্যালেরিয়া হলো। রস আবিষাকার করলেন- ম্যালেরিয়া নামক ভয়ংকর রোগটির পালন ও বিস্তার মশাদের মধ্যে এনোফিলিশ জাতের শুধুমাত্র নারীরাই দায়ি। পুরুষরা রক্তলোলুপ বা হিংস্র নয়। তারা ফল, গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তারা মানুষের ঘরে ঢোকার চেয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। কিন্তু নারীরা মোটেও সেরকম নিরীহ নয়। এনোফিলিস নারীরা প্রচন্ড ভয়ংকর। মানুষ বা গবাদিপশুর রক্ত খেতে তারা খুব ভালোবাসে। মানুষের ঘরের বিছানায়, চেয়ারের ফাঁকে এরাই অবৈধভাবে ঘুরে বেড়ায় ও পেটে পেটে জীবাণু ছড়ায়। ডোরাকাটা সুন্দরী নারী এনোফিলিসরা ম্যালেরিয়ার জীবাণূকে পেটের ভিতরে আশ্রয় দেয়; জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে পূর্ণঙ্গতাপ্রাপ্ত হয়। তখন এদের Sporozoite বলে। Sporozoite নারী এনোফিলিসদের ঠোঁট সংলগ্ন লালা গ্রন্থিতে থাকে। অর্থাৎ মশাটি যখন মানুষকে কামড় বসায় তখনই প্যারাসাইটগুলো সেই ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে। আর এভাবেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু একের পর একে ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে থাকে।
ডা: রস তাঁর এই আবিষ্কারের কথা প্রাথমিক দিকে কয়েকজনকে বলেছিলেন। অনেকে তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু তিনি ধৈর্য্য ধরে গবেষণা করে সকলের সামনে তাঁর প্রমাণ উপস্থিত করলেন।
ডা: রসকে তাঁর এই অনবদ্য কীর্তির জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রে ১৯০২ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু একটি মাত্র অনুবীক্ষণ যন্ত্র সম্বল করে মেজর রস মানব জাতির যে উপকার করেছেন তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর আবিষ্কারের আগে প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে ম্যালেরিয়া একটি ভয়ংকর রোগের নাম ছিলো। ডা: মেজর রস ম্যালেরিয়া উৎপত্তির যথার্থ স্থান চিহ্নিত করেমানুষের অসহায় মৃত্যুর সম্ভাবনাকে একেবারে সীমিত করে এনেছেন। পরে তার নামে Institute of Tropical Medicine এর নামকরন করা হয়। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই মহান চিকিৎসকের মৃত্যু হয়।
Read More ...

Wednesday, February 27, 2008

অমর বিজ্ঞানী এডিসন

অমর বিজ্ঞানী এডিসন
সুশান্ত বর্মন

১৮৫৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকার ওহিও রাজ্যের মিলান শহর। পরপর একটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তান মারা যাবার পর জন্ম নিল একটি পুত্র সন্তান। এডিসন শ্যামুয়েল নামক কাঠ ব্যবসায়ীর ঘরে। নাম তাঁর টমাস অ্যালভা এডিসন। ডাক নাম অ্যাল। পৃথিবীর অন্যান্য শিশুদের মতো হৈ হুল্লোড় আনন্দ উল্লাস তিনিও করেছে, অন্যদের মতো পৃথিবীর সবকিছু সম্পর্কে একচোখ প্রশ্ন তাঁরও ছিল; মাতা পিতাকে অনবরত কেন কি ইত্যাদি প্রশ্ন করে জ্বালিয়েছেন। কিন্তু অন্য শিশুদের মতো পিতামাতার মনগড়া উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি। নিজে নিজে উত্তর খোঁজার প্রবল আগ্রহে দশ বছর বয়সেই তিনি বাড়ির সেলারে (মাটির নীচের ঘর) তৈরি করেছিলেন। সেখানে বসে রাজ্যের জিনিস নিয়ে অনবরত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যেতেন। রসায়ন শাস্ত্রের প্রতি এডিসনের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ছিল। তাই তাঁর ল্যাবরেটরিতে দুইশরও বেশি বোতলে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ভরা ছিল, প্রত্যেকটার গায়ে এডিসন সযতনে কাগজে নাম লিখে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ল্যাবরেটরিতে আর ছিল বই। তিনি নয় বছর বয়সেই এমন সব বই পড়েছিলেন যা বড়রাও পড়তে ভয় পায়। যেমনঃ হিউম এর ‘ইংল্যান্ডের ইতিহাস’, গিবন এর ‘রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস’, ফ্রেসিলিয়াস এর ‘কোরলেটিভ আনালাসিস’, সিয়ার এর ‘পৃথিবীর ইতিহাস’, ‘বিজ্ঞানের অভিধান’, ‘স্কুল অব ন্যাচারাল ফিজিক্স’ ইত্যাদি। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে তিনি বুঝে নিতে চেয়েছেন তাঁর কৌতুহলী মনে উন্মেষ হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নের। নিউটনের লেখা ‘প্রিন্সিপিয়া’ বইটিও এডিসন প্রতিদিন একটু একটু করে পড়তেন, বোঝার চেষ্টা করতেন এর উচ্চতর গণিত বিষয়ক বিভিন্ন সূত্রগুলো। তবে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ফ্যারাডের মতো তিনিও অংকে নিতান্ত কাঁচা ছিলেন। বাবা চাইতেন ছেলে সাহিত্যিক হোক। তাই সেকালের বিভিন্ন রুচিশীল সাহিত্যের বই তিনি নিয়মিত ছেলের জন্য নিয়ে আসতেন। অতটুকু ছেলের সাথে সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করতেন। তবে এডিসনের সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় ছিল বিজ্ঞান বিশেষ করে রসায়ন। তবে সে সময় বিদ্যুত প্রথম আবিষ্কার হয়। তাই এডিসন বিদ্যুত আবিষ্কারের শৈশব অবস্থা থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে বিদ্যুত সম্পর্কিত বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কারে তিনি বেশি সফল হয়েছিলেন। ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে বসে বিভিন্ন বইয়ে লেখা বিবরণ পড়ে এডিসন চেষ্টা করতেন নতুন কিছু বানাবার। একটি বইয়ে তিনি পড়েছিলেন বেলুনে গ্যাস ভর্তি করলে তা আকাশে ওড়ে। তিনি ভাবলেন তাহলে তো মানুষের ভিতরে গ্যাস ভর্তি করে দিলে মানুষও আকাশে উড়বে। যেই ভাবা সেই কাজ। কাজের ছেলে মাইকেল ওটসকে এডিসন ডাকলেন। একটি বোতলে সিডলিজ পাউডার ছিল। এডিসন ভেবেছিলেন ঐ পাউডার দিয়ে হয়তো অনেক গ্যাস তৈরি হবে। তাই মাইকেল ওটসকে সিডলিজ পাউডার সবটুকু খাইয়ে দিলেন। ওটস এর পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হলেও সে উড়তে পারেনি। আরেকবার একটি মুরগীকে ডিমে তা দিতে দেখে এডিসন ভাবলেন তিনিও ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটাতে পারবেন। হঠাৎ একদিন এডিসন উধাও হয়ে গেলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া গেল গোয়াল ঘরের একপাশে। সেখানে তিনি অনেকগুলো ডিমের ওপর বসেতা দিচ্ছিলেন।
এমনি মজার কিন্তু অনুসন্ধিৎসু গবেষণা নিয়েই এডিসন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিলেন। নিরন্তর গবেষণার মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করছিলেন। তার প্রথম আবিষ্কার এর সাথে বাংলাদেশের অবস্থার একটি দারুণ মিল আছে। একুশ বছর বয়সে এডিসন একটি ভোট রেকর্ডার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এতে ভোটাভোটি নিজে থেকেই লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এডিসন রাজধানী ওয়াশিংটনে যন্ত্রটিকে নিয়ে এলেন। সেখানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেখালেন। তাঁরা সবাই যন্ত্রটির খুব প্রশংসা করলেন এবং এডিসনকে এমন করিৎকর্মা যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু যন্ত্রটি তাঁরা কিনলেন না। কারণ হিসাবে বললেন- “এ যন্ত্রটি আমাদের কোন কাজেই আসবে না। কেননা ভোট দেয়া নিয়ে হাঙ্গামা, গণ্ডগোল, গোলযোগ, গোলমাল, ঝগড়াঝাঁটি করাই আইনসভার লক্ষ্য, বিনা ঝামেলায় ভোট নেয়া নয়।” এমন অদ্ভূত কারণে তাঁর আবিষ্কারটি গৃহীত হলো না দেখে এডিসন মনোক্ষুন্ন হলেও নিরুৎসাহিত হয়ে যাননি। তিনি জানতের রাজনীতিকরা এমনই হয়।
পিতার কাছ থেকে এডিসন যা হাতখরচ পেতেন তাতে তাঁর ল্যাবরেটরির খরচ যোগানো কঠিন হয়ে যেতো, তাই তিনি শুরু করলেন ফেরি করা। ট্রেনে ফেরি করে তিনি বাদাম, চকলেট ইত্যাদি বিক্রি করতেন। পরে শুরু করেন সংবাদপত্র বিক্রি করা। সমসাময়িক সময়ে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ চলছিলো। খবরের চাহিদা বেশি হওয়ায় নিজেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করলেন। নাম দিলেন হেরাল্ড। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি এই কাজ শুরু করেন। সে কাগজে দুচারটি বানান ভুল, বাক্য ভুল থাকলেও কাগজটি ভালই চলেছিল। যুদ্ধের তাজা খবর, স্থানীয় খবর, গুজব ইত্যাদি প্রকাশ করতেন তিনি। তাই সেসময় কাগজটি খুব বিক্রি হচ্ছিল। অনেক টাকা লাভ হলেও এডিসনের হাত প্রায়ই খালি থাকতো। ল্যাবরেটরিতে গবেষণা ও বই কেনার পিছনেই তাঁর বেশিরভাগ টাকা খরচ হয়ে যেতো। রেলে খবরের কাগজ বিক্রি করতে গিয়ে তিনি দেখলেন একটি খালি কামরা অব্যবহৃত পড়ে আছে। তখন সেটাকেই তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নিজের ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করলেন। এখানে কাজ করতে করতেই তিনি বিদ্যুৎ শক্তি সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। বিদ্যুৎ সম্পর্কে কৌতুহল তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল সমৃদ্ধি ও সাফল্যের চূড়ায়।
সেসময় নতুন আবিষ্কার হওয়া টেলিগ্রাফ যন্ত্রের একটা ত্রুটি ছিল। বহুদূরের দুই টেলিগ্রাফ কেন্দ্রের মাঝখানে যে কেন্দ্রগুলি ছিল সেগুলি আর দিক থেকে পাঠানো খবর গ্রহণ করতে ও তাতে পরিবর্তন করতে পারতো। ফলে গোপনীয়তা বলতে কিছু থাকতো না। এডিসন এই ত্রুটিটি ঠিক করে দিয়েছিলেন। সেকালে টেলিগ্রাফ যন্ত্রের একটি তার দিয়ে একটি খবরই পাঠানো যেতো। এডিসন একসাথে অনেকগুলো খবর বিকৃতি ছাড়া পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। টেলিগ্রাফ সম্পর্কিত গবেষণা করতে করতে তিনি পাশাপাশি আরও কয়েকটি নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এরকমই একটি যন্ত্রের নাম ‘রেমিংটন টাইপরাইটার’। কিছুদিন পর আবিষ্কার করেন ‘মিলিওগ্রাফ’ নামের একটি যন্ত্র। এটি দিয়ে টাইপরাইটার বা হাতে লেখা চিঠি যত ইচ্ছা তত কপি করা যায়।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আবিষ্কার করা টেলিফোনে কথা খুব অস্পষ্ট শোনা যেতো। এডিসন কার্বন রিসিভার ও ট্রান্সমিটার আবিষ্কার করে এই ত্র“টি ঠিক করে দেন। সমসাময়িক সময়েই তিনি আবিষ্কার করেন ‘ফনোগ্রাফ’ নামক যন্ত্রটি। একটি ডায়াফ্রেমের সামনে কথা বললে সেটি কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনি একটি সুই দ্বারা নিচে রাখা ঘুর্ণায়মান মোমের সিলিন্ডারে দাগ ফেলতে থাকে। পরে সিলিন্ডারটি আবার প্রথম থেকে ঘোরালে ডায়াফ্রেমে পূর্বে উচ্চারিত কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যায়। আধুনিক সিডি প্লেয়ারের এই প্রাথমিক ও সরল যন্ত্রটি আবিষ্কার করতে এডিসনকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছিল এর প্রদর্শণ অনুষ্ঠানে। হলভর্তি লোকের সামনে যন্ত্রটি যখন এডিসনের প্রিয় কবিতা “মেরি হ্যাড এ লিটিল ল্যাম্ব” কবিতাটি আবৃতি করছিল তখন বিজ্ঞানে অবিশ্বাসী এক ব্যক্তি হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়লো। মঞ্চে উঠে এডিসনের গলা চেপে ধরে বললো- ‘এই প্রতারকের গলা থেকে শব্দ বেরোচ্ছে’। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে যন্ত্রটি তখনও কবিতা আবৃতি করে যাচ্ছিল।
এডিসনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আবিষ্কার হল বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার। আকাশের বিদ্যুতকে মানুষ তখন ব্যাটারিতে আটকাতে পেরেছিলো। তারপরও কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি যে তা থেকে আলো পাওয়া সম্ভব। এডিসন নিজ মেধা ও প্রচেষ্টায় সেই অলৌকিকতাকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে অক্টোবর মাসে তিনি স্থানীয় পার্ক বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করে সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন। আধুনিক যুগের সিনেমার আবিষ্কারকও ছিলেন তিনি। ১৮৯৭ সালের ২৭ এপ্রিল নিউইয়ের্কে হাজার হাজার দর্শকের সামনে এডিসন তাঁর ‘কাইনেটোস্টোপ’ নামক যন্ত্রের সাহায্যে চলমান ছবি দেখিয়েছিলেন। শিল্প জগতে জন্ম দিয়েছেন নতুন একটি যুগের। তিনি সিমেন্ট, আধুনিক সহজে বহনযোগ্য ব্যাটারি, রাবার ইত্যাদি আবিষ্কার করেছেন।
পেটেন্ট অফিস থেকে জানা যায় এডিসন তাঁর সারাজীবনে মোট ১৪০০ যন্ত্রের জন্য পেটেন্ট নিয়েছেন। এ থেকেই তাঁর প্রতিভার বিস্তৃতির পরিমাপ আন্দাজ করা যায়। কোন একটি নতুন আইডিয়া মাথায় এলে তিনি তার পিছনে নিষ্ঠার সাথে লেগে থাকতেন। অনবরত পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে সাফল্যকে স্পর্শ করতে চাইতেন। তাঁর অধ্যবসায়ের শক্তি সম্পর্কে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যথেষ্ঠ। হেনরী ফোর্ড সে সময় মোটর গাড়ি আবিষ্কার করেছেন। এই গাড়িতে সহজে পরিবহনযোগ্য নিরাপদ ব্যাটারির প্রয়োজন। এজন্য তিনি বন্ধু এডিসনকে অনুরোধ করেন। এডিসন নতুন ধরনের ব্যাটারি আবিষ্কারের নেশায় সব কাজ ছেড়ে এদিকে মনোযোগ দিলেন। একটি হালকা, টেকসই, সহজে বহনযোগ্য, নিরাপদ ব্যাটারির জন্য তিনি ৫০ হাজার বার পরীক্ষা করেন। তারপর আবিষ্কার করেন তার সাফল্য। তাঁর প্রথম জ্বলা বৈদ্যুতিক বাতিটির ফিলামেন্ট ছিল সুতার তৈরি। এটি একনাগাড়ে ৫০ ঘন্টা জ্বলেছিলো। এরপর যথার্থ উপাদানের জন্য তিনি হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তাকেই কাজে লাগানোর চেষ্ট করেছিলেন। টিস্যু কাগজ, ড্রয়িং কাগজ, আলকাতরা আর ভুষাকালি মাখানো সুতো, মাছ ধরার সুতো, কাঠের টুকরো, নারকেলের ছিবড়ে, প্রদীপের সলতে কিছুই বাদ দেননি। বৈদ্যুতিক বাতিতে ফিলমেন্ট হিসাবে জ্বলার জন্য একটি যথার্থ উপাদানের খোঁজে তিনি কয়েকবছর ধরে নিরলস অন্বেষণ চালিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর সুমাত্রার বাঁশের আঁশকে কাজে লাগাতে পেরেছেন। পরবর্তীতে অবশ্য ট্যাংস্টেন নামক ধাতু দিয়ে ফিলামেন্ট তৈরি করে তিনি বেশ সাফল্য পেয়েছিলেন। অধ্যবসায়ী এডিসন পরাজয় কাকে বলে তা চিনতে শেখেননি। পরবর্তী সফল জীবনে বিভিন্ন জায়গার ভাষণে তিনি একটা কথাই বারবার বলতেন- “প্রতিভার ষোল আনার চৌদ্দ আনাই হল পরিশ্রম, বাকী দু আনা প্রেরণা।” তিনি ২৪ ঘন্টায় ৪ ঘন্টার বেশি ঘুমাতেন না। তিনি বলতেন- “আমরা খুব বেশি ঘুমাই। এত ঘুম আমাদের ক্ষতি ছাড়া লাভের কারণ হয় না।”
শৈশবে এডিসন ‘বোকা’ উপাধি পেয়েছিলেন বন্ধু, শিক্ষক, পরিবারের কাছ থেকে এবং পড়াশোনায় বিশেষ করে অংকে খুবই কাঁচা ছিলেন। স্কুলে শিক্ষক ও ছাত্ররা এনিয়ে তাঁকে পরিহাস করলে তিনি বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেন। তাঁর মামাতো বোন পরবর্তীকালে বলেছিলেন- “অ্যাল খুব শান্ত সুবোধ ছিল। কিন্তু যখন গোঁ ধরতো তখন আর কোন কথাই তাকে শোনানো যেতো না। তাকে আমি খুব মারতাম। কিন্তু আমাদের মধ্যে বেশ ভাবও হয়েছিল।”
এডিসন পড়া ও পড়ার বাইরে পছন্দ করতেন থিয়েটার দেখা ও দেশ ভ্রমণ। অল্প বয়স থেকেই এডিসন পড়ার প্রতি যে আগ্রহ নিজের ভেতরে বোধ করেছেন তা থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। কিন্তু এ কারণে তাঁকে অনেকে হিংসা করতো। এডিসন অল্পবয়সেই মেধা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন তা অনেকেই ঈর্ষাবশত সহ্য করতে পারেননি। এডিসনের সহকর্মী মিলটন অ্যাডামস বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়াতেন- “অ্যালের পোষাক পরিচ্ছদ নোংরা ও ছোঁড়া ছিল, নিয়মিত স্নান করতো না। নাকটা উঁচু, চোখেমুখে সর্বদাই নেপোলিয়নের মত একটা ভাব।” যে এডিসন সম্পর্কে তাঁর সহকর্মীরা এমন নিন্দা করে বেড়াতো সেই তিনিই পরবর্তী জীবনে ভূষিত হয়েছিলেন বিভিন্ন সম্মানে। ১৯২১ সালে তাঁর ৭৫ বছর পূর্ণ হয়। নিউইয়র্কের টাইমস পত্রিকা আমেরিকার মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যক্তি কে তা যাচাইয়ের জন্য একটি জরীপ করে। ফলাফল অনুসারে দেখা যায় সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যক্তি ‘টমাস অ্যালভা এডিসন’। ফ্রান্সে তাঁকে দেয়া হয় ‘কমান্ডার অব লিজিয়ন অনার্স’ উপাধি, ইতালিতে তাকে ‘কাউন্ট’ উপাধি দেয়া হয়। তাঁর নিজদেশ আমেরিকায় তিনি দেশসেবার জন্য স্বর্ণপদসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন, ভূষিত হয়েছেন বহু সম্মানজনক উপাধিতে। সরকার এডিসনের ছবি ও তাঁর আবিষ্কৃত প্রথম বৈদ্যুতিক বাল্বের ছবি দিয়ে ডাক টিকিট বের করেছিলেন। এই অমর বিজ্ঞানী সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট হুভার বলেছিলে-Ñ “ মি. এডিসন স্বীয় প্রতিভা আর প্রচেষ্টার বলে গৌরবের উচ্চশিখরে আহরণ করেছেন। আর দশজন মানুষের মতই তিনি সাধারণ ভাবে জীবন যাত্রা শুরু করে আজ সমাজের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তি। এডিসনের জীবন অধ্যাবসায় এবং ধৈয্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
মহান বিজ্ঞানী এডিসন মারা যান ১৯৩১ সালের ১৭ অক্টোবর। সমাপ্ত ঘটে একটি নিরলস প্রচেষ্টায় গাঁথা কর্মবহুল জীবনের। পৃথিবীতে রেখে যান অসংখ্য আবিষ্কার যা তাঁকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে। পৃথিবীর অগ্রগতিতে তার অবদান বেঁচে থাকবে মানুষের বয়সে।
Read More ...