Showing posts with label উদ্ভাবন. Show all posts
Showing posts with label উদ্ভাবন. Show all posts

Monday, January 12, 2009

২০০৮ সালের সেরা ১০টি বৈজ্ঞানিক ঘটনা -০২

নতুন জগৎ:
বিজ্ঞানীরা সবসময় এমন ধারণা করতেন যে সূর্য ছাড়াও এমন নক্ষত্র আছে যার চারপাশে পৃথিবীর মতো গ্রহ নিয়মিত আবর্তিত হয়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের আগে এরকম বহির্জাগতিক গ্রহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই বৎসরে এরকম কিছু সৌরজগতের দেখা মেলে। ২০০৮ সালের জুন মাসে মাইকেল মেয়র (Michel Mayor) ৪৫টি সৌরজগত খুঁজে পান, এর কয়েকটি পৃথিবীর চাইতে মাত্র ৪.২গুণ বড়। কিন্তু সেগুলোতে প্রাণ বিকাশের উপযোগী কোন পরিবেশ রয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখার মতো শক্তিশালী যন্ত্র মেয়রের ছিলনা। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মহাকাশবিজ্ঞানীদের দুটো দল চারটি বহির্জাগতিক পৃথিবীর দেখা পান। এই প্রথম এ জাতীয় ভিনগ্রহের স্পষ্ট ও আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে তোলা ছবি পাওয়া গেল।

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া:
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী বার্কলে (Berkeley) এবং কালিফ (Calif) ঘোষণা করেন যে, তারা এমন পোষাক আবিষ্কার করতে পেরেছেন যা পরিধান করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্ভব । বিষয়টা আসলে পদার্থ ও আলোকবিজ্ঞানের এক জটিল সংমিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তারের একটি জালিকা এলুমিনিয়ামের টিউবের ভিতরে স্থাপন করে একটি পাতলা কাপড়ের মতো বস্তু উদ্ভাবন করেছেন। এটা কাগজের চাইতে ১০ গুণ বেশি পাতলা। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তারা এই পদার্থ দিয়ে এমন একটি বহিরাবরণ তৈরি করতে পারবেন, যার মধ্যদিয়ে আলোর স্রোত প্রবাহিত করলে তা কার্যকরীভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই বিষয়টা এখনও পরীক্ষাধীন। খরচও অনেক বেশি। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতে আমরা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি, এই আবিষ্কারের ফলে একথা বলা আর কঠিন নয়।

সিনোজয়িক পার্ক (Cenozoic Park):
একগুচ্ছ চুল সাধারণত কোন খবরের হেডলাইন হয়না। কিন্তু ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে এমনই একটা ঘটনা ঘটে গেল। জীবরসায়নের অধ্যাপক স্টিভেন স্কাসটার (Stevan Schuster) ঘোষণা করলেন যে তিনি লোমশ ম্যামথের চুল থেকে তার জিনোমের ৮০ ভাগ পুনর্গঠন করতে পেরেছেন। এটা শুধুমাত্র তিন বিলিয়ন ডিএনএ'র ধারাবাহিকতাকে একত্রিত করা নয়, এই ঘটনাটি ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবের অন্তর্গত উপাদানকে বুঝতে সহায়তা করবে। তবে এখনি জুরাসিক পার্কের মতো লোমশ ম্যামথের কোন দল তৈরি করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই আবিষ্কার যে সেই সম্ভাবনাকে উস্কে দেয়নি, তা বলা কঠিন।

বিজ্ঞান পড়ুয়ার পরিসংখ্যান:
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের পরিমাণ ১৯৭৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৭% হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য জানতে সম্প্রতি মিসিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জনৈক অধ্যাপক এক জরীপ চালান। এতে দেখা যায় বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কিঞ্চিত বেড়েছে। মাত্র ২৫%। যে জাতি উড়োজাহাজ, বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছে, যারা চাঁদে পা রেখেছে তাদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের এই পরিমাণ মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

প্রথম পরিবার:
মধ্য জার্মানিতে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো পরিবারের ফসিল পাওয়া গেছে। ৪৬০০ বৎসরের পুরনো এই পরিবারটি কোন আক্রমণের শিকার হয়ে মারা গেছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পাথর যুগের এই পরিবারটির প্রত্যেক সদস্যের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে মেরুদণ্ড ক্ষতবিক্ষত ছিল। পরিবারের দুইটি পুরুষ শিশুর একটি ৮-৯ বৎসর বয়স ও অন্যটি ৪-৫ বৎসর বয়সের ছিল। হয়তো এই পরিবারটিই সবচাইতে পুরনো পরিবার নয়। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফসিলের মধ্যে এটিই যে পুরনো পরিবারের এতে কোন সন্দেহ নাই।

সূত্র: টাইম
Read More ...

Saturday, March 15, 2008

নরকের শয়তান ব্যাঙ

মাদাগাস্কারে কর্মরত বিজ্ঞানীরা জীবিত ছিল এমন সবচেয়ে বড় ব্যাঙের ফসিলের সন্ধান পেয়েছেন। নিউইয়র্কের স্টোনিব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওনটোলজিস্ট ডেভিড ক্রুজ এবং তার কলিগ এক যুগ ধরে ফসিলের টুকরোগুলোকে একটু একটু করে উত্তোলন করেছেন। ৭৫ টুকরো জীবাস্মকে একবছর ধরে জোড়া দিয়েছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ব্যাঙের জীবাস্ম বিশেষজ্ঞ সুজান ইভানস।

তাদের ভাষ্যমতে এই ব্যাঙের বয়স ৭০ মিলিয়ন বছর। বিচ বলের সমান আকার, ১৬ ইঞ্চি( ৪১ সে.মি.) উচু এবং ৪.৫ কি.গ্রা. (১০ পাউন্ড) ওজনের।

এই আবিষ্কার আরও একটি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছ্ প্রাপ্ত ফসিলটির নিকটতম প্রজাতি পৃথিবীর অর্ধেক দূরত্বে দক্ষিন আমেরিকায় পাওয়া গেছে। আকারে অনেক ছোট, কিন্তু একই রকম বড় চোয়াল এবং একই রকম আক্রমণাত্মক। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রাপ্ত বড় মুখের ব্রাঙের নাম সেরাটোফাইরিন। এরা খুবই আগ্রাসী মনোভঙ্গীর, অনেকক্ষণ ধরে এক জায়গায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থেকে হঠাৎ করে শিকারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে। এগুলোর চেয়ে দুই তিন গুণ বড় ফসিলটির আগ্রাসন নিশ্চয়ই আরও বেশি ছিল। ধারণা করা হয় তারা শক্ত চোয়াল এবং নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থার সাহায্যে ডিম থেকে সদ্য বের হওয়া ডাইনোসরের বাচ্চাদের শিকার করত। একজন বিজ্ঞানী মনে বলেন- যখন আমরা আরও কয়েকটি শিংওয়ালা ব্যাঙের প্রজাতি আবিষ্কার করলাম তখন "নরকের শয়তান ব্যাঙ" নামটি যথার্থ বলে মনে হয়েছিল।

Read More ...

Thursday, March 6, 2008

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ২

মানুষের কংকাল বিষয়ে হাজার বছরের প্রচলিত বিশ্বাস এর বিপরীতে ভেসালিয়াসের এই আবিষ্কার সারা ইউরোপে দারুণ সাড়া ফেলে দিলো। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় দেয়া বক্তব্যে ভেসালিয়াস সেই অপরাধীর কংকাল আবিষ্কার এর বিষয়টি উল্লেখ করে বলতেন- আমি যদি গভীর রাতে কংকাল দেখে আধিভৌতিকতাকে বিশ্বাস করে ভয় পেতাম তাহলে আজ সত্যকে চিনতে পারতামনা। যদি মহান গ্যালেনকে ধ্রুবসত্য বলে বিশ্বাস করতাম তাহলে আজ জানা হতো না বৈজ্ঞানিক সত্যটি। বন্ধু ক্যালকার এর আঁকা ছবি ও নিজের পর্যবেক্ষণজাত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা উপস্থাপন করে ভেসালিয়াস তাঁর নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তুললেন। নিখুঁত চিত্র ও বিস্তারিত তথ্যে বেশিরভাগ জনগণ নিজেদের বিশ্বাসের সাথে বৈজ্ঞানিক সত্যের পার্থক্য বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা নিজেদেরকে বোকা ভাবতে চাইলেন না। তাই বাড়িতে ঢিল, রাস্তায় হুমকী, মারধর ইত্যাদি সহিংস পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ভেসালিয়াসকে বিরক্ত করতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে ভেসালিয়াস প্যারিস ছেড়ে ইটালিতে চলে এলেন। ইটালির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে ইটালি অনেকটা উদার ও সহনশীল সমাজ তৈরি করতে পেরেছিলো। রক্ষণশীলতার বন্ধ কপাট ইটালিতে অনেকাংশেই খোলা ছিলো। সেখানকার কর্তৃপক্ষ প্রাচীন পুস্তককেই একমাত্র সত্যি কথা বলে বিশ্বাস করতে নারাজ ছিলেন বলেই মেধাবী গবেষকদের কাছে ইটালি দেশটির একটি আলাদা মর্যাদা ছিলো। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমির অধ্যাপক পদে ভেসালিয়াস নিযুক্ত হন মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে, ১৫৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে।
ভেসালিয়াস বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এভাবে চিরকাল বক্তৃব্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই যদি একটি বই লেখা যেতো তাহলে খুব ভালো হতো। পাদুয়ায় শিক্ষকতা ও গবেষণার আঁকে ফাঁকে কয়েক বছরের নিরলস চেষ্টার পর একটি গ্রন্থ লেখা সম্পূর্ণ করলেন। সমকালীন নীতিবাদীদের অনেক বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে প্রকাশিত হওয়া গ্রন্থটির নাম- ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’। বাংলায় ‘মানব দেহের অঙ্গসংস্থান’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি একটি বিশাল স্থান গ্রহণ করে আছে। মানব শরীরের অভ্যন্তরস্থ প্রত্যঙ্গগুলো সম্পর্কে এটাই প্রথম যথাযথ বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ। মানুষের হাড়, মাংশপেশী, প্রত্যঙ্গের গঠন, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সম্পর্কে নিখুঁত আলোচনা ও বন্ধু ক্যালকার-এর আঁকা চিত্র প্রাচীন বিজ্ঞানের অনেক মীথ ভেঙে ফেলেছে। তাঁর আলোচনা পদ্ধতি ছিলো সরল ও প্রাণবন্ত। তাঁর বর্ণনাপদ্ধতি এখনও আধুনিক শারীরবিদদের পথ প্রদর্শন করে চলেছে। হাড়, পেশী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও ক্যালকার এর আঁকা প্রামাণ্য চিত্র দিয়ে ভেসালিয়াস গ্যালেনপন্থীদের অবস্থান দূর্বল করে দিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ভেসালিয়াসের কীর্তিতে সমৃদ্ধ হলেও কতিপয় ব্যক্তিবর্গের মন তুষ্ট হয়নি। ভেসালিয়াস তাঁর ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটি প্রকাশের কাজ তদারক করতে একদিন ইটালি ছেড়ে বেলজিয়ামে যান। প্রিয় ও মেধাবী ছাত্রটিকে তাঁর অবর্তমানে কাজ চালিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। কয়েক দিন পর ফিরে এসে দেখেন তাঁর প্রিয় ছাত্রটি কূটবুদ্ধি ও গ্যালেনপন্থীদের সাথে ভালো যোগাযোগের সুযোগে নিজ অবস্থান পাকা করেছে। ছাত্রটি তাঁর মেধাবী কর্মকৌশলে ভেসালিয়াসকে সরিয়ে নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেবার কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেসালিয়াসের সাথে কোন কথা বললেন না; তাঁর দেয়া কোন যুক্তিকেই তাঁরা বহন করলেন না। অপমানিত ভেসালিয়াস দারুণ লজ্জায় নিজেকেও গুটিয়ে নিলেন। তাঁর এতদিনের গবেষণা-পড়াশোনা নিজের কাছেই ভুল বলে মনে হতে লাগলো। যে মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর এত চেষ্টা তার কোন মূল্যই চারপাশের মানুষরা গ্রহণ করতে পারছে না দেখে তিনি প্রচণ্ড হতাশা বোধ করলেন। আসলে ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি তাঁর সমকালের তুলনায় অনেক অগ্রগামী চিন্তার মানুষ ছিলেন। হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য অযথা আর চিন্তা করবেন না। সম্রাট চার্লস এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নতুন কাজে যোগ দিলেন। এতদিনের দরিদ্রতা নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। রাজার সংস্পর্শে এসে মুহূর্তেই তার অনেক টাকা উপার্জিত হয়ে গেল। ফ্রান্সের সবচেয়ে অভিজাত ব্যক্তিবর্গের মাঝে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফ্রান্সের বেশ খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। বর্ণাঢ্য জীবন আর মোহনীয় নারীদের মাঝে সারাক্ষণ বাস করলেও ভেসালিয়াসের মন পড়ে থাকতো পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। কিন্তু ফিরে যাবার পরিবেশ ছিলো না আর। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই তিনি হাস্যপ্রিয় নারীদের কোলাহলে মিশে যেতেন। সমাজনেতা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূর্খতার প্রভাবে এভাবেই একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অপমৃত্যু হলো।
বিশ বছর পরে পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক গাব্রিয়েল ফেলোপিয়াস বুঝতে পারেন মানব শরীর বিষয়ক সত্য তথ্যটি। তিনি গ্যালেনের তথ্যের অসারতা ও ভেসালিয়াসের যথার্থতা প্রমান করে ও ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটির প্রভূত প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। একটি চিকিৎসা বিষয়ক ম্যাগাজিনে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। সবাই নতুন করে ভেসালিয়াসকে বিচার করতে চাইলেন। তরুণ ডাক্তাররা সবাই আধুনিক ও কুসংস্কারমুক্ত মনের ছিলো। তারা অনেকেই নিজে নিজে গোপনে পরীক্ষা করে দেখে গ্যালেনের দেয়া ভুল তথ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলো। প্রশাসন ও নীতিবাদীদের নির্যাতনের ভয়ে এতকাল চুপ থাকলেও এখন তারা কোন বাধা মানলো না। অপেক্ষাকৃত মুক্ত মনের নতুন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্বতনদের সিদ্ধান্তের অসারতা বুঝতে পারলেন। তাঁরা ভেসালিয়াসকে পূর্বপদে পুনর্বহাল করে চিঠি দিলে তিনি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। মূর্খ প্রবীণদের ভুল তরুণরা বুঝতে ও সংশোধন করতে চাইছে জেনে তিনি আশান্বিত হন। ফিরে আসতে চাইলেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আসার পথে এক শক্তিশালী ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে তিনি সহ জাহাজের সমস্তু যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। অনেক খোঁজাখুজি করেও জাহাজের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর তীর্থযাত্রীদের একটি জাহাজ সামুদ্রিক ঝড়ে দিকবিভ্রান্তির ফলে চলে আসে ‘জান্তে’ নামক একটি দ্বীপে। ঝড় থামলে তীর্থযাত্রীদের সবাই দ্বীপের বালুতটে একটি জাহাজের ভগ্নাংশ ও বেশ কয়েকটি কংকাল দেখতে পেলেন। সবাই একটি লাশের পাশে দেখলেন ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ নামক গ্রন্থটি। তাদের মধ্যে কারও কারও গ্রন্থটি পড়া ছিলো। তারা উপকূল থেকে একটু উচু জায়গায় ভেসালিয়াসের কংকালটি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখলেন। একটি কাঠে তাঁর নাম লিখে মাথার কাছে পুঁতে রাখলেন।
এক তরুণ বিজ্ঞানসচেতন ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী বিজ্ঞানী ভেসালিয়াস তাঁর চারপাশের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের চাইতে এক পা এগিয়ে ছিলেন। সময়ের চাইতে অগ্রগামী এই ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞাকে তাই তাঁর সমাজের নেতারা বুঝে উঠতে পারেননি। এখনকার মতো সেকালেও সব সামাজিক নেতারা জনগণকে নিজেদের চাইতে মূর্খ ভাবতেন। তাই ভেসালিয়াসের প্রজ্ঞাকে তাঁরা মাপতে পারেননি। বুঝতে পারেননি এই অমর চিকিৎসাবিজ্ঞানীর যাথার্থ। কিন্তু সত্য তথ্য যা তা কখনও চাপা থাকেনি। কুসংস্কারবাদী শক্তিমানদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বিফল প্রমাণিত করে আমরা নিজেরাও আজ জানি যে মানুষের হাঁড়ের বিন্যাস, পেশী সংস্থান, বিভিন্ন অঙ্গের গঠনের সাথে কুকুর-শুকরের হাঁড় বিন্যাস, পেশী সংস্থান বা বিভিন্ন অঙ্গের গঠন বা কার্যাবলীর কোন মিলই নেই। এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশ্বাসকে আঘাত করে করুক তাতে সত্য বসে থাকেনি। বিশ্বাসবাদী গ্যালেনপন্থীরাই যে ভুল ছিলো তা আজ আর কোন ভীততথ্য নয়। এখন শিশুরাও জানে যে নারী-পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই; কারও কোন বিশেষ হাঁড়ও বিকৃত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতদিন বিজ্ঞান সম্মত থাকবে, যদি চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনো বিশ্বাস নির্ভরতার পাতা ফাঁদে পা না দেয় তাহলে চিরকাল প্রশংসার সাথে স্মরণ করবে ‘আধুনিক এনাটমী শাস্ত্রের জনক’ ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস এর অমর কীর্তিকে।
Read More ...

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ১

ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস

সুশান্ত বর্মন

বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান। যা অন্যসব জ্ঞানের মতো নয়। যে জ্ঞান আমাদেরকে এগিয়ে দেয়। মনের কঠিন অন্ধকার দূর করে, দিগন্ত আলোকিত করে। আমাদের মুখোমুখি করে দারুণ সত্যের। আমাদের শতচর্চিত ধারণা বা বিশ্বাসগুলো ভয় পায় বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের সগৌরব যাত্রাপথে নানা বিঘ্ন ঘটাতে চায় এবং ঘটায়। তবুও বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। নানা আক্রমণের মুখেও মহাকাশবিদ্যা, জীববিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের একাধিক শাখা সমাজের মূর্খ নেতাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করেছে। সত্য প্রকাশের দায়ে নির্যাতিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সক্রেটিস, ব্রুনো প্রমুখের নাম চিরস্মরণীয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চাইতে সামাজিক নীতির হাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। কখনও কখনও বিজ্ঞান ও ধর্ম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। কখনও একটি অসাধারণ তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে হঠাৎ করে এসে গেছে, কখনও কোন একটি জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে অভাবিতভাবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনি অনেক ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিজ্ঞান যে কখনও কোন পুরনোবাদীর ইচ্ছার কাছে থেমে থাকেনি এইসব ঘটনার কাছ থেকে আমরা তাই শিখে নেই।

ব্রাসেলস এর এক সম্ভ্রান্ত ফ্লেমিশ বংশে আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার রূপকার ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস ১৫১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রাসেলস এর স্কুল, লোভেন এর কলেজ ও প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তাঁর সময়কালের সমাজের নৈতিক কাঠামো কেমন ছিল ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয় শতকে গ্রীসে জন্মেছিলেন গ্যালেন নামক একজন প্রভাবশালী চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব। অনেক সুখ্যাতি ছিলো তাঁর। তিনি তাঁর একটি বইতে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন যে- কুকুর, শুকর, ছাগল, খরগোশের সাথে মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন- সজ্জাপদ্ধতি, সংখ্যা একই রকম। গ্যালেনের এমন মন্তব্যের কথা জেনে অনেকের হাসি আসতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এখনও এদেশে অনেকে মনে করে দুজনে মানুষ হলেও নারীর ও পুরুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা সমান নয়। উদারবাদী বলে পরিচিত উচ্চশিক্ষিত অনেকে মনে করেন কথাটা সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক সত্যি অর্থাৎ নারী এবং পুরুষ পরস্পরের মধ্যে কোন এক জনের একটি বিশেষ হাড়ের আকৃতিতে নাকি পার্থক্য আছে। মহান গ্যালেনের ধারণাকে সত্য মনে করে নিয়ে ডাক্তারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে এ্যানাটমি শেখাতেন। কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোস, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীর ব্যবচ্ছেদ করে ছাত্রদেরকে মানুষের শরীরের অঙ্গ সংস্থান বোঝাতেন। সেকালের কুসংস্কার এতো প্রবল ছিলো যে মৃত মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করা নৈতিক দিক থেকে মহাঅপরাধ বলে বিবেচনা করা হতো। অর্থাৎ গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখানো হতো যে মানুষের শরীরের হাড়ের সংস্থানের সাথে কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোশ, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীরের হাড়ের গঠন-সন্নিবেশ ও প্রত্যঙ্গ সজ্জার কোন অমিল নেই।
১৫৩৩ সালের শরৎকালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলজিয়াম থেকে একটি নতুন ছাত্র আসে। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নামডাকওয়ালা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ডাক্তারী শেখার জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। সেখানকার এনাটমী শিক্ষা গ্যালেন প্রভাবেব বাইরে নয়, তবুও শুধু নামের কারণেই ছাত্র সংখ্যার কোন কমতি ছিল না। বেলজিয়াম থেকে আসা ছাত্রটির নাম ভেসালিয়াস। তিনি এনাটমীর ক্লাশে শুকর-কুকুরের ব্যবচ্ছেদ দেখতে দেখতেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেনÑ গ্যালেনের বক্তব্যে নিশ্চয় ভুল আছে। হাজার বছর ধরে প্রচলিত বিশ্বাস এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ভেসালিয়াসের ছিলো। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ এখনও তাঁর সংগ্রহ করা হয়নি। তাই তিনি প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এর মধ্যে একদিন তিনি তাঁর এই ধারণার কথাটা প্রকাশ করলেন। বন্ধুরা কেউ কেউ হেসেছিলো, কেউবা পাগল বলে ব্যঙ্গ করেছিলো। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা প্রচন্ড খেপে গেলেন। ভেসালিয়াসকে মিথ্যাবাদী, পাগল, পাপী ইত্যাদি বলে বেড়াতে লাগলেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শারীরিক আঘাতের হুমকীও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভেসালিয়াস বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতেন। তাই পরাজয় স্বীকার করেননি। অপেক্ষা করছিলেন একটি যথার্থ প্রমাণের। সম্পূর্ণ মানব কংকাল হলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু লাশ ব্যবচ্ছেদ করা সামাজিক আইন অনুযায়ী অনৈতিক ও অন্যায়। তা অপরাধ বলে শাস্তিযোগ্য। তাই সেদিকে যাওয়া ভেসালিয়াসের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। অভাবিতভাবেই একদিন হঠাৎ করে তিনি একটি সম্পূর্ণ কংকাল পেয়ে গেলেন। সেকালে সমস্ত ইউরোপে ফাঁসীতে আসামীদের হত্যা করা একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি ছিলো। শহরের বাইরে এক নির্জন পাহাড়ী এলাকায় আসামীদেরকে ফাঁসী দেয়া হতো। ভেসালিয়াস একদিন বৈকালিক ভ্রমণ করতে করতে চিন্তামগ্ন অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশে ফাঁসী দেয়ার জায়গাটায় চলে এলেন। দেখলেন দুই এক মাস আগে ফাঁসী দেয়া এক আসামীর শুকনো কংকালটি ফাঁসী মঞ্চের পাটাতনে পড়ে আছে। লোকজনের চোখ এড়িয়ে কয়েকরাত ধরে বহন করে তিনি সম্পূর্ণ কংকালটি নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। জীবনে কখনো মানুষের কংকাল না দেখা ভেসালিয়াস একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ শুরু করে দিলেন। অনেক পরিশ্রম করে হাড়গুলো ধাতব তার দিয়ে জোড়া দিয়ে একটি সম্পূর্ণ মানব কংকাল সাজিয়ে ফেললেন। সম্পূর্ণ সাজানো কংকালটির দিকে তাকিয়ে ভেসালিয়াস বুঝে ফেললেন এতদিন যা শিখেছেন তা মোটেও সত্য নয়। এতকালের ধারণা-বিশ্বাস, শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতি, সামাজিক সমর্থন সবগুলোই মানুষের হাড়সজ্জা বিষয়ে সম্পূর্ণ কল্পনাশ্রয়ী ও অপপ্রচার মাত্র। মানুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা, গঠন ও সন্নিবেশ পদ্ধতির সঙ্গে গ্যালেন বর্ণিত কুকুর-শিয়াল প্রভৃতি প্রাণীর হাড় সংস্থানের কোন মিল নেই। সামাজিক চাপ এতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও হিংস্র ছিলো যে গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে ভেসালিয়াস পর্যন্ত জন্ম নেয়া অসংখ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী এই সাধারণ তথ্যটুকুই এতদিন আবিষ্কার করতে পারেননি। ভেসালিয়াসের অমর আবিষ্কারের কারণেই আমরা জানি মানুষের হাড়ের চাইতে পশুর হাড়ের সজ্জার যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে, জানি নারী ও পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই। উভয়েরই ২০৬টি করে হাড় রয়েছে। এমনকি দুজনের কোন একটি বিশেষ হাড়েও কোন বিকৃতি নেই।
Read More ...