Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Sunday, June 29, 2008

নিয়ান্ডারথাল'রা বুদ্ধিমান ছিল

১৯০০ সালে ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের এই খননক্ষেত্রটি আবিষ্কার হয়েছিল। সেখান থেকে সম্প্রতি কিছু অসাধারণ দ্রব্য আবিষ্কার করা হয়েছে। একটি নতুন সৌধ তৈরি করার জন্য ভিত্তি খুঁড়তে গিয়ে মাটির গভীরে একটা ফাটল চোখে পড়ে। এই ফাটলের ভিতর থেকে সযত্নে সাজিয়ে রাখা ২৩০০টি পাথরের অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়।

ইউসিএল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ম্যাথু পোপ মনে করেন এই অস্ত্রগুলো কারিগরি দিক থেকে পূর্বে প্রাপ্ত অস্ত্রগুলোর চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক। তিনি আরও বলেন - বৃটেনের আদিম মানব প্রজাতির তৈরি আর কোন যন্ত্র এত সুচারু ও কর্মক্ষম ছিল না। উত্তর ইউরোপে অনুপ্রবেশ করা কোন নিয়ান্ডারথাল মানবগোষ্ঠীর শেষ শিকারী দল এগুলো ফেলে রেখে গেছে এমন ভাবতে পেরে আমি সত্যিই উত্তেজিত। এই যন্ত্রগুলো দেখে তাদের উদ্ভাবকদের দক্ষতা ও বুদ্ধিবৃত্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। ভূগোল ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দ্রব্যাদির উপর যে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, তা তারা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।

ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের (West Sussex) পুলবরো (Pulborogh) এলাকায় প্রাপ্ত এই পাথুরে যন্ত্রগুলোর বয়স প্রায় ৩৫,০০০ থেকে ৪২,০০০ বৎসর। একই খননএলাকায় প্রাপ্ত অন্যান্য অস্ত্রগুলোর চেয়ে এই অস্ত্রগুলোর কার্যক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। নিয়ান্ডারথালদের সম্পর্কে আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চাইতে বেশি অগ্রসর ও বুদ্ধিমান যে তাদের ছিল, সম্প্রতি প্রাপ্ত অস্ত্রগুলোর তার প্রমাণ দিয়েছে। যন্ত্রের উদ্ভাবন, তৈরি্ও ব্যবহার কৌশলে তারা পূর্বধারণার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ছিল।

যন্ত্রগুলো নিয়ে গবেষণারত ড. জ্যাকব বলেন -শিকার করার জন্য নির্ভরযোগ্য ও কার্যকরী অস্ত্র তৈরি করা কোন সহজ কাজ নয়। নিয়ান্ডারথালদের আরও পুরো অস্ত্র আবিষ্কার হয়েছে। সেগুলো ছিল লম্বা, সোজা ও কম ধারালো। তৈরি পদ্ধতির ছাপ সেগুলোতে স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু নবআবিষ্কৃত অস্ত্রগুলো ভিন্নরকম। ধারাল কোণগুলো কিছুটা বাঁকা, তৈরি পদ্ধতির ছাপ নেই বললেই চলে। অস্ত্রগুলোর শরীর মসৃণ ও নিখুঁত।

নিয়ান্ডারথালদের অস্ত্রাদি বেশিরভাগ সময়ে বেলে পাথরের ফাটলের মধ্যে পাওয়া গেছে। পাহাড় বা মাটির গভীরের গুহায় নিয়ান্ডারথালরা বহুকাল বাস করেছিল। সেই সময়ে তারা কোন উদ্দেশ্যে অস্ত্রগুলো সংরক্ষণ করার জন্য একের পর এক সাবধানে সাজিয়ে রেখেছিল। এ থেকেও বোঝা যায়, নিয়ান্ডারথালরা যতোটা ভাবা হয়েছিল, ততোটা বোকা ছিল না। প্রাসঙ্গিক তথ্য এই যে, এই নিয়ান্ডারথাল মানুষদের মনে সর্বপ্রথম জন্ম, মৃত্যু, জীবন, প্রকৃতি তথা দর্শনভাবনার উদ্ভব হয়েছিল।
Read More ...

Friday, June 6, 2008

১০০ বৎসর বয়সী বাল্ব





গতমাসের একটি খবর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লিভারমোর ফায়ার সার্ভিসের একটি বাতি গত ১০৭ বৎসর ধরে জ্বলছে। বৎসরের সংখ্যাটি সত্যিই অবাক করার মত। কারণ সাধারণত বৈদ্যুতিক বাতির আয়ু এত বেশি হয় না। আধুনিক কালের বাল্বগুলোও এতদিন টেকে না। সেখানে কার্বন ফিলামেন্টে তৈরি পুরনো একটি বাল্ব এত বৎসর ধরে জ্বলছে বিষয়টি সত্যিই মনোযোগ না কেড়ে পারে না।

১৯০১ সালে লিভারমোর ফায়ার সার্ভিসের অফিসে এটা লাগানো হয়। ঠিক কি কাজের দায়িত্ব বাল্বটির উপর ন্যস্ত ছিল তা খবরে বিস্তারিত বলা নেই। তবে ধারণা করি আলো বিতরণ করা নয় শুধুমাত্র বিদ্যুতের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এর প্রধান দায়িত্ব ছিল। কারণ বাল্বটির আলো প্রজ্জ্বলন ক্ষমতা বেশি নয় (খবরে বাল্বটির ওয়াট উল্লেখ নেই), ছবি দেখে বোঝা যায় শুধুমাত্র টিমটিম করে এটা জ্বলত। অনেকটা নিয়ন বাতির মত শুধুমাত্র ফিলামেন্টটা আলোকজ্জ্বল হয়ে থাকত। আলোর রোশনাই চারপাশে ছড়াতো না।

খবরে বলা আছে লিভারমোর দমকল অফিসের কর্মীরা এই বাল্বটিকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করত। তাই কোন কারণে যদি নষ্ট হয়ে যায় সেই আশঙ্কায় বাল্বটি তারা পরিষ্কার করত না। নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এটা কখনও বন্ধ করা হয় নি। শুধু ১৯৭৬ সালে দমকল অফিসটি পাল্টানোর সময় সকেটের গোড়া থেকে তার কেটে বাল্বটিকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তখন মাত্র ১০ মিনিটের জন্য বাল্বটি বন্ধ ছিল। প্রযুক্তির এটা এক বিস্ময়কর খবরই বটে!
উল্লেখ্য যে বাল্বটির গুণের খবর চাপা থাকেনি। গীনেস রেকর্ড বুক বাল্বটিকে তাদের বইয়ে জায়গা দিয়ে বাল্বটির গুণকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই বাল্বটিকে উদ্দেশ্য করে একটি ওয়েব সাইট খোলা হয়েছে। বিস্তারিত জানা যাবে এখানে
Read More ...

Sunday, April 20, 2008

বাংলাদেশের ঝড়ের ইতিহাস ৩

১৯৬৩ (২৮-২৯ মে): চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজারসহ উপকূলবর্তী দ্বীপ কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও মহেশখালীতে আঘাত হানে। ১১ হাজার ৫২০ জনের মৃত্যু ঘটে।

১৯৬৫ (১১-১২ মে): বরিশাল ও বাকেরগঞ্জে ১৬ হাজার ৪৫৬ জনের মৃত্যু ঘটে।

১৯৬৪ (১৪-১৫ ডিসেম্বর): কক্সবাজার, পটুয়াখালী জেলাসহ সোনাদিয়া, রাঙ্গাদিয়া ও হামিদিয়া দ্বীপে আঘাত হানে। ৮৭৩ জনের মুত্যু ঘটে।

১৯৬৬ (১ অক্টোবর): সন্দ্বীপ, বাকেরগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় আঘাত হানে। ৮৫০ জনের মৃত্যু ঘটে।

১৯৬৯ (১৪ এপ্রিল): ঢাকা জেলার ডেমরায় টর্ণেডো আঘাত হানে। ৯২২ জন মারা যায়।

১৯৭০ (১২-১৩ নভেম্বর): বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রাণ ও সম্পদ বিনষ্টকারী ধ্বংসাত্মক ঘুর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। চট্টগ্রাম, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী, চর বোরহানউদ্দিন, চর তজিমুদ্দিন, মাইজদীর দক্ষিণাঞ্চল ও হরিণঘাটা এলাকায় ওই ঘুর্ণিঝড়ের আঘাতে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯৭১ (৫-৬ নভেম্বর): চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানে। মানুষ ও গবাদি পশুর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

১৯৭৩ (৬-৯ ডিসেম্বর): সুন্দরবন ও পটুয়াখালীর নিম্নাঞ্চলে আঘাত হানে।

১৯৭৪ (১৩-১৫ আগস্ট): খুলনায় আঘাত হানে। ৬০০ জনের মৃত্যু ঘটে।

১৯৭৪(২৪-২৮ নভেম্বর): কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। ২০০ জনের মৃত্যু ঘটে।

১৯৭৭ (৯-২২ মে): খুলনা, নোয়াখালী, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও উপকূলবর্তী দ্বীপগুলোয় আঘাত হানে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।

১৯৮৩ (১৪-১৫ অক্টোবর): উপকূলবর্তী দ্বীপগুলো এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।

১৯৯১ (২৫-২৯ এপ্রিল): সম্পদের আর্থিক ক্ষতির ছিল ৬,০০০ কোটি টাকা। মৃত্যু হয়েছিল ১,৫০,০০০ মানুষের। ৭০,০০০ গবাদি পশু এ ঝড়ে মারা যায়।

১৯৯৮ (১৯-২২ নভেম্বর): উপকূলবর্তী দ্বীপগুলো এবং খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর চরাঞ্চলে ব্যাপক জলোচ্ছ্বাসসহ ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে। রাস্তাঘাট ও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে সঠিক হিসাব জানা যায়নি।

এছাড়া ১৫ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক ঝড় 'সিডর' দেশের ২২টি জেলায় আঘাত হানে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা খুলনা, বরিশাল এবং দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। এর মধ্যে ছিল ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, মংলা ও সাতক্ষীরা। ১৩১ বৎসরের মধ্যে সংঘটিত বড় ১০টি ঝড়ের মধ্যে সিডর ছিল সবচাইতে শক্তিশালী। ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঘূর্ণিঝড়টি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। নাসা'র মতে এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ২৬০-২৮০ কিলোমিটার। সাফিন সিম্পসন স্কেল অনুযায়ী নাসা সিডরকে ৪ নম্বর ক্যাটাগরির ঝড় বলে চিহ্নিত করেছে। সিডরের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২.৩ বিলিয়ন ডলার বা ১৬,১০০ কোটি টাকা। রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির মতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার। আর সরকারের মতে, ২২৯৯ জন।
Read More ...

Saturday, April 19, 2008

বাংলাদেশের ঝড়ের ইতিহাস ২

১৯১৩: ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আঘাত হানে। ৫০০ জনের প্রাণহানি ঘটে।

১৯১৭: খুলনায় আঘাত হানে। ৪৩২ ব্যক্তি নিহত।

১৯৪২: সুন্দরবনে আঘাত হানে। বন্যপ্রাণী মারা যায় এবং বহু নৌযান ডুবে যায়।

১৯৪১: মেঘনা মোহনায় বহু মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে।

১৯৪৮: চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে এক হাজারেরও বেশি প্রাণহানি ঘটে।

১৯৫৮ (২১-২৪ অক্টোবর): চট্টগ্রামের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল, লক্ষাধিক পরিবার গৃহহীন হয় এবং মারা যায় অনেকে।

১৯৬০ (৯-১০ অক্টোবর): নোয়াখালীর বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলায় আঘাত হানে। চরজব্বার, চরআমিনা, চরভাটা, রামগতি, হাতিয়া ও নোয়াখালরি প্রায় তিনহাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।

১৯৬০ (৩০-৩১ অক্টোবর): চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, পটুয়াখালী এবং মেঘনার মোহনার পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। সাড়ে পাচ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।

১৯৬১ (৯ মে): বাগেরহাট ও খুলনা সদরে আঘাত হানে। ১১ হাজার ৪৬৮ জনের মৃত্যু হয়।

১৯৬২ (২৬-৩০ অক্টোবর): ফেনীতে আঘাত হানে। এক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
Read More ...

Friday, April 18, 2008

বাংলাদেশের ঝড়ের ইতিহাস

ইতিহাসে বেশ কিছু ঝড়ের নাম আছে যেগুলো এই বাংলাদেশ অঞ্চলের প্রভুত ক্ষতি সাধন করেছিল। সেই সব বিখ্যাত ঝড়গুলোর তালিকা সংক্ষেপে নিচে দেয়া হল। সংগ্রহ করা হয়েছে যায় যায় দিন পত্রিকার ৪ এপ্রিল ২০০৮ সংখ্যা থেকে।

১৫৮৪: বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালী জেলায় আঘাত হানে। বজ্রবিদ্যুতসহ হারিকেনের বৈশিষ্ট্য সংবলিত এ ঝড় পাঁচ ঘন্টা স্থায়ী হয়। মানুষ ও গৃহপালিত জীব মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটে।

১৭৯৭: চট্টগ্রাম অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। সাধারণ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি জাহাজ নিমজ্জিত হয়।

১৮২২: বরিশাল, হাতিয়া দ্বীপ ও নোয়াখালী জেলায় আঘাত হানে। ৪০ হাজার মানুষ ো এক লাখ গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে।

১৮৩১: বরিশাল অঞ্চল আক্রান্ত হয়। প্রাণহানি ঘটে সামান্য।

১৮৭২: কক্সবাজারে আঘাত হানে। বহু প্রাণহানি ঘটে।

১৮৭৬: মেঘনা মোহনা এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল ও নোয়াখালী জেলায় আঘাত হানে। প্রায় দুই লাখ লোক মারা যায়।

১৮৯৭: চট্টগ্রাম ও কুতুবদিয়া দ্বীপে আঘাত হানে। ৩২ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

১৮৯৮: টেকনাফে আঘাত হানে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব জানা যায়নি।

১৯০৪: সোনাদিয়া দ্বীপে আঘাত হানে। ১৪৩ জনের জীবনহানি ঘটে।

১৯০৯: খুলনা অঞ্চলে আঘাত হানে। ৬৯৮ জন মানুষ ও ৭০ হাজারেরও বেশি গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে।
Read More ...

Friday, March 28, 2008

সৃষ্টির সূত্র: গালাপাগস দ্বীপ

সুশান্ত বর্মন

সারা পৃথিবীর দুই ভাগ জল ও এক ভাগ স্থলএই বিশাল জলরাশির বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য দ্বীপ খুঁজে পাওয়া যায়এগুলোর কোনটি রাজনৈতিকভাবে আবার কোনটা অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণকিন্তু কিছু কিছু দ্বী বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে যে অবদান রেখে গেছে তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয়গালাপাগস তেমনি একটি দ্বীপপুঞ্জএই দ্বীপমালায় প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক চার্লস ডারউইন কয়েকমাস থেকেছেনবিস্ময়কর ও রহস্যময় অসংখ্য পশুপাখিতে পরিপূর্ণ দ্বীপগুলোতে ভ্রমণ করে ডারউইন প্রাণী সৃষ্টি ও বিকাশের সূত্রটি খুঁজে পেয়েছেনএই দ্বীপের বিভিন্নরকম প্রাণী নিজেদের নানারকম বৈচিত্র্য ডারউইনের কাছে তুলে ধরে প্রমাণ করেছে মানুষ পতনের ফল ন; উৎকর্ষের ফল

অদ্ভূত ধরণের প্রাণী দিয়ে পূর্ণ এই দ্বীপমালার কথা প্রথম জানা যায় ১৫৩৫ সালেফ্রে টমাস নামে একজন খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারকারী জাহাজে করে পেরু যাচ্ছিলেনপথে বেশ কিছু দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জের দেখা পেলেনসেখানে তিনি অনেক অদ্ভূত অদ্ভূত গাছপালা ও প্রাণী দেখলেনতিনি দেখলেন এই দ্বীপমালার প্রাণীজগতের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের প্রাণীদের চাইতে একেবারে আলাদা রকমতিনি সেখানে বিদঘুটে ডিজাইনের গিরগিটি, বিশাল বিশাল কচ্ছপ, বিভিন্ন ধরণের ঠোঁটওয়ালা একই জাতের পাখি, কাঁটাওয়ালা নাশপাতি গাছ ইত্যাদি দেখতে পেলেনতাঁর সহ জাহাজের সবার দৃষ্টি কেড়েছিলো কচ্ছপগুলোএগুলোর সাইজ এত বিরাট যে কয়েকজন মানুষকে পিঠে নিয়ে চলাফেরা করা এদের কাছে কোন ব্যপার নয়পরম আনন্দে তারা মাংসের জন্য জাহাজ ভর্তি করে কচ্ছপ নিয়ে নিলোদ্বীপগুলোর নাম রাখলেন গালাপাগসস্পানিস ভাষায় গালাপাগস অর্থ কচ্ছপপ্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপটিতে এমন কিছু বিচিত্র প্রাণীর নমুনা রয়েছে যা পৃথিবীর আর অন্য কোথাও নেইঅন্য কোন দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথেও গালাপাগস দ্বীপমালার পরিবেশ মেলেনাসারা বছর প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপে থেকে গবেষণা করেনপ্রকৃতি বিজ্ঞানীদের কাছে স্বর্গসদৃশ এই দ্বীপ ৬৫টি ছোট ও ১৩টি প্রধান দ্বীপ নিয়ে গঠিতসবচাইতে বড়টির নাম ইসাবেলাএছাড়াও আছে ফার্নান্দেজ, সান্টিয়াগো, মারচনাপিন্টা, জোনো, ভেসা, পিনজোন ইত্যাদি নামের দ্বীপগালাপাগস দ্বীপে অনেক রকমের পাথর ও জীবাশ্ম (Fossil) পাওয়া গেছেএগুলোর C12 পরীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বোঝা যায় দ্বীপটি গঠিত হয়েছে ৩৫ লক্ষ বছর আগেসমস্ত দ্বীপটি আসলে একটি বড় পাহাড় দিয়ে গঠিতএখানে বেশ কয়েকটি মৃত আগ্নেয়গিরি রয়েছেএই আগ্নেয়গিরিগুলির লাভা উদগীরণের ফলে দ্বীপগুলোর সৃষ্টি হআবহাওয়া প্রায় শুকনোবছরের অনেক সময় খরা থাকেহঠাৎ হঠাৎ সেখানে বৃষ্টি হয়সেখানকার স্পানিস লোকেরা এই হঠাৎ বৃষ্টির নাম দিয়েছে 'এল নিনো'। বৃষ্টির পরপর দ্বীপমালার চিত্র দ্রুত পাল্টে যায়চারিদিক সবুজ ঘাসে ভরে যায়, রুক্ষ্ম পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি বন্য ফুল ফুটে থাকেপাখিরা ছড়িয়ে পড়ে সারা দ্বীপেদ্বীপমালাটির আবহাওয়া ও ভূমি কিছুটা রুক্ষ্ম হলেও সেখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও প্রাণীজ বৈচিত্রের কোন কমতি নেইস্থলভূমিতে দেখা যায় অনেক রকমের পাখিটিয়ে, কাকাতুয়াসহ বিভিন্ন রকমের পাখি; বিশাল সাইজের টিকটিকি জাতীয় প্রাণী ও ছোট ছোট প্রাণী রয়েছে এই দ্বীপটিতেতবে ডাঙ্গার তুলনায় গালাপাগস দ্বীপের জলজ প্রাণীরা অধিকতর বৈচিত্র্যময়দ্বীপটি বিষুব অঞ্চলীয় হলেও সেখানে সীল রয়েছে প্রচুরএছাড়া রয়েছে উড়ুক্কু মাছ, বিভিন্ন ধরণের হাঙর, কয়েক রকমের তিমি, বিভিন্ন জাতের অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য মাছগালাপাগস দ্বীপের সবচাইতে রাজকীয় প্রাণীটি হলো কচ্ছপগালাপাগস দ্বীপমালার প্রায় সব জায়গায় পাওয়া যায় বিশাল বিশাল সব কচ্ছপ পাশ দিয়ে যাওয়া বেশিরভাগ জাহাজযাত্রীরা এই এলাকায় এসে প্রাচীনকাল থেকে এই কিছুকাল আগে পর্যন্ত কচ্ছপ শিকার করে নিয়ে যেতোএছাড়াও এই দ্বীপটিতে রয়েছে বিশাল বিশাল আকৃতির শুকরসাধারণ শুকরের আকার যেখানে সর্বোচ্চ ৫/৬ মন হয় সেখানে এই শুকরগুলোর ওজন হয় ৮/১০ মনখাদ্য হিসেবে কচ্ছপের পাশাপাশি শুকরগুলির চাহিদা এখনও খুব রয়েছে

কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর পায় ৫০/৬০ বছর পরে গালাপাগস দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার হয়তারপর থেকেই লোভী ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি পড়লো এই দ্বীপগুলোর উপরতারা দলে দলে এখানে এসে নির্বিচারে তিমি, সীল, কচ্ছপ, শুকর শিকার করতে লাগলোফলে কয়েকশ বছরের মধ্যেই দ্বীপটির পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেলো১৮ শতকেই মূলত এ অঞ্চলে প্রচুর তিমি ও সিল নিধন করা হয়েছেদক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর এই তিনশ বর্গকিলোমিটার জায়গা ব্যপী বিস্তৃত গালাপাগস দ্বীপপুঞ্জের মালিকইকুয়েডর সরকার মূল ভূখন্ড থেকে ১ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপমালাকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিষ্ময়কর প্রাণীগুলোকে সংরক্ষণের অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে
Read More ...

Thursday, March 6, 2008

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ২

মানুষের কংকাল বিষয়ে হাজার বছরের প্রচলিত বিশ্বাস এর বিপরীতে ভেসালিয়াসের এই আবিষ্কার সারা ইউরোপে দারুণ সাড়া ফেলে দিলো। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় দেয়া বক্তব্যে ভেসালিয়াস সেই অপরাধীর কংকাল আবিষ্কার এর বিষয়টি উল্লেখ করে বলতেন- আমি যদি গভীর রাতে কংকাল দেখে আধিভৌতিকতাকে বিশ্বাস করে ভয় পেতাম তাহলে আজ সত্যকে চিনতে পারতামনা। যদি মহান গ্যালেনকে ধ্রুবসত্য বলে বিশ্বাস করতাম তাহলে আজ জানা হতো না বৈজ্ঞানিক সত্যটি। বন্ধু ক্যালকার এর আঁকা ছবি ও নিজের পর্যবেক্ষণজাত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা উপস্থাপন করে ভেসালিয়াস তাঁর নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তুললেন। নিখুঁত চিত্র ও বিস্তারিত তথ্যে বেশিরভাগ জনগণ নিজেদের বিশ্বাসের সাথে বৈজ্ঞানিক সত্যের পার্থক্য বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা নিজেদেরকে বোকা ভাবতে চাইলেন না। তাই বাড়িতে ঢিল, রাস্তায় হুমকী, মারধর ইত্যাদি সহিংস পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ভেসালিয়াসকে বিরক্ত করতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে ভেসালিয়াস প্যারিস ছেড়ে ইটালিতে চলে এলেন। ইটালির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে ইটালি অনেকটা উদার ও সহনশীল সমাজ তৈরি করতে পেরেছিলো। রক্ষণশীলতার বন্ধ কপাট ইটালিতে অনেকাংশেই খোলা ছিলো। সেখানকার কর্তৃপক্ষ প্রাচীন পুস্তককেই একমাত্র সত্যি কথা বলে বিশ্বাস করতে নারাজ ছিলেন বলেই মেধাবী গবেষকদের কাছে ইটালি দেশটির একটি আলাদা মর্যাদা ছিলো। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমির অধ্যাপক পদে ভেসালিয়াস নিযুক্ত হন মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে, ১৫৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে।
ভেসালিয়াস বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এভাবে চিরকাল বক্তৃব্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই যদি একটি বই লেখা যেতো তাহলে খুব ভালো হতো। পাদুয়ায় শিক্ষকতা ও গবেষণার আঁকে ফাঁকে কয়েক বছরের নিরলস চেষ্টার পর একটি গ্রন্থ লেখা সম্পূর্ণ করলেন। সমকালীন নীতিবাদীদের অনেক বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে প্রকাশিত হওয়া গ্রন্থটির নাম- ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’। বাংলায় ‘মানব দেহের অঙ্গসংস্থান’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি একটি বিশাল স্থান গ্রহণ করে আছে। মানব শরীরের অভ্যন্তরস্থ প্রত্যঙ্গগুলো সম্পর্কে এটাই প্রথম যথাযথ বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ। মানুষের হাড়, মাংশপেশী, প্রত্যঙ্গের গঠন, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সম্পর্কে নিখুঁত আলোচনা ও বন্ধু ক্যালকার-এর আঁকা চিত্র প্রাচীন বিজ্ঞানের অনেক মীথ ভেঙে ফেলেছে। তাঁর আলোচনা পদ্ধতি ছিলো সরল ও প্রাণবন্ত। তাঁর বর্ণনাপদ্ধতি এখনও আধুনিক শারীরবিদদের পথ প্রদর্শন করে চলেছে। হাড়, পেশী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও ক্যালকার এর আঁকা প্রামাণ্য চিত্র দিয়ে ভেসালিয়াস গ্যালেনপন্থীদের অবস্থান দূর্বল করে দিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ভেসালিয়াসের কীর্তিতে সমৃদ্ধ হলেও কতিপয় ব্যক্তিবর্গের মন তুষ্ট হয়নি। ভেসালিয়াস তাঁর ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটি প্রকাশের কাজ তদারক করতে একদিন ইটালি ছেড়ে বেলজিয়ামে যান। প্রিয় ও মেধাবী ছাত্রটিকে তাঁর অবর্তমানে কাজ চালিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। কয়েক দিন পর ফিরে এসে দেখেন তাঁর প্রিয় ছাত্রটি কূটবুদ্ধি ও গ্যালেনপন্থীদের সাথে ভালো যোগাযোগের সুযোগে নিজ অবস্থান পাকা করেছে। ছাত্রটি তাঁর মেধাবী কর্মকৌশলে ভেসালিয়াসকে সরিয়ে নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেবার কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেসালিয়াসের সাথে কোন কথা বললেন না; তাঁর দেয়া কোন যুক্তিকেই তাঁরা বহন করলেন না। অপমানিত ভেসালিয়াস দারুণ লজ্জায় নিজেকেও গুটিয়ে নিলেন। তাঁর এতদিনের গবেষণা-পড়াশোনা নিজের কাছেই ভুল বলে মনে হতে লাগলো। যে মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর এত চেষ্টা তার কোন মূল্যই চারপাশের মানুষরা গ্রহণ করতে পারছে না দেখে তিনি প্রচণ্ড হতাশা বোধ করলেন। আসলে ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি তাঁর সমকালের তুলনায় অনেক অগ্রগামী চিন্তার মানুষ ছিলেন। হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য অযথা আর চিন্তা করবেন না। সম্রাট চার্লস এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নতুন কাজে যোগ দিলেন। এতদিনের দরিদ্রতা নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। রাজার সংস্পর্শে এসে মুহূর্তেই তার অনেক টাকা উপার্জিত হয়ে গেল। ফ্রান্সের সবচেয়ে অভিজাত ব্যক্তিবর্গের মাঝে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফ্রান্সের বেশ খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। বর্ণাঢ্য জীবন আর মোহনীয় নারীদের মাঝে সারাক্ষণ বাস করলেও ভেসালিয়াসের মন পড়ে থাকতো পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। কিন্তু ফিরে যাবার পরিবেশ ছিলো না আর। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই তিনি হাস্যপ্রিয় নারীদের কোলাহলে মিশে যেতেন। সমাজনেতা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূর্খতার প্রভাবে এভাবেই একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অপমৃত্যু হলো।
বিশ বছর পরে পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক গাব্রিয়েল ফেলোপিয়াস বুঝতে পারেন মানব শরীর বিষয়ক সত্য তথ্যটি। তিনি গ্যালেনের তথ্যের অসারতা ও ভেসালিয়াসের যথার্থতা প্রমান করে ও ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটির প্রভূত প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। একটি চিকিৎসা বিষয়ক ম্যাগাজিনে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। সবাই নতুন করে ভেসালিয়াসকে বিচার করতে চাইলেন। তরুণ ডাক্তাররা সবাই আধুনিক ও কুসংস্কারমুক্ত মনের ছিলো। তারা অনেকেই নিজে নিজে গোপনে পরীক্ষা করে দেখে গ্যালেনের দেয়া ভুল তথ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলো। প্রশাসন ও নীতিবাদীদের নির্যাতনের ভয়ে এতকাল চুপ থাকলেও এখন তারা কোন বাধা মানলো না। অপেক্ষাকৃত মুক্ত মনের নতুন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্বতনদের সিদ্ধান্তের অসারতা বুঝতে পারলেন। তাঁরা ভেসালিয়াসকে পূর্বপদে পুনর্বহাল করে চিঠি দিলে তিনি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। মূর্খ প্রবীণদের ভুল তরুণরা বুঝতে ও সংশোধন করতে চাইছে জেনে তিনি আশান্বিত হন। ফিরে আসতে চাইলেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আসার পথে এক শক্তিশালী ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে তিনি সহ জাহাজের সমস্তু যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। অনেক খোঁজাখুজি করেও জাহাজের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর তীর্থযাত্রীদের একটি জাহাজ সামুদ্রিক ঝড়ে দিকবিভ্রান্তির ফলে চলে আসে ‘জান্তে’ নামক একটি দ্বীপে। ঝড় থামলে তীর্থযাত্রীদের সবাই দ্বীপের বালুতটে একটি জাহাজের ভগ্নাংশ ও বেশ কয়েকটি কংকাল দেখতে পেলেন। সবাই একটি লাশের পাশে দেখলেন ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ নামক গ্রন্থটি। তাদের মধ্যে কারও কারও গ্রন্থটি পড়া ছিলো। তারা উপকূল থেকে একটু উচু জায়গায় ভেসালিয়াসের কংকালটি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখলেন। একটি কাঠে তাঁর নাম লিখে মাথার কাছে পুঁতে রাখলেন।
এক তরুণ বিজ্ঞানসচেতন ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী বিজ্ঞানী ভেসালিয়াস তাঁর চারপাশের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের চাইতে এক পা এগিয়ে ছিলেন। সময়ের চাইতে অগ্রগামী এই ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞাকে তাই তাঁর সমাজের নেতারা বুঝে উঠতে পারেননি। এখনকার মতো সেকালেও সব সামাজিক নেতারা জনগণকে নিজেদের চাইতে মূর্খ ভাবতেন। তাই ভেসালিয়াসের প্রজ্ঞাকে তাঁরা মাপতে পারেননি। বুঝতে পারেননি এই অমর চিকিৎসাবিজ্ঞানীর যাথার্থ। কিন্তু সত্য তথ্য যা তা কখনও চাপা থাকেনি। কুসংস্কারবাদী শক্তিমানদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বিফল প্রমাণিত করে আমরা নিজেরাও আজ জানি যে মানুষের হাঁড়ের বিন্যাস, পেশী সংস্থান, বিভিন্ন অঙ্গের গঠনের সাথে কুকুর-শুকরের হাঁড় বিন্যাস, পেশী সংস্থান বা বিভিন্ন অঙ্গের গঠন বা কার্যাবলীর কোন মিলই নেই। এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশ্বাসকে আঘাত করে করুক তাতে সত্য বসে থাকেনি। বিশ্বাসবাদী গ্যালেনপন্থীরাই যে ভুল ছিলো তা আজ আর কোন ভীততথ্য নয়। এখন শিশুরাও জানে যে নারী-পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই; কারও কোন বিশেষ হাঁড়ও বিকৃত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতদিন বিজ্ঞান সম্মত থাকবে, যদি চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনো বিশ্বাস নির্ভরতার পাতা ফাঁদে পা না দেয় তাহলে চিরকাল প্রশংসার সাথে স্মরণ করবে ‘আধুনিক এনাটমী শাস্ত্রের জনক’ ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস এর অমর কীর্তিকে।
Read More ...

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ১

ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস

সুশান্ত বর্মন

বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান। যা অন্যসব জ্ঞানের মতো নয়। যে জ্ঞান আমাদেরকে এগিয়ে দেয়। মনের কঠিন অন্ধকার দূর করে, দিগন্ত আলোকিত করে। আমাদের মুখোমুখি করে দারুণ সত্যের। আমাদের শতচর্চিত ধারণা বা বিশ্বাসগুলো ভয় পায় বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের সগৌরব যাত্রাপথে নানা বিঘ্ন ঘটাতে চায় এবং ঘটায়। তবুও বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। নানা আক্রমণের মুখেও মহাকাশবিদ্যা, জীববিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের একাধিক শাখা সমাজের মূর্খ নেতাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করেছে। সত্য প্রকাশের দায়ে নির্যাতিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সক্রেটিস, ব্রুনো প্রমুখের নাম চিরস্মরণীয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চাইতে সামাজিক নীতির হাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। কখনও কখনও বিজ্ঞান ও ধর্ম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। কখনও একটি অসাধারণ তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে হঠাৎ করে এসে গেছে, কখনও কোন একটি জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে অভাবিতভাবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনি অনেক ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিজ্ঞান যে কখনও কোন পুরনোবাদীর ইচ্ছার কাছে থেমে থাকেনি এইসব ঘটনার কাছ থেকে আমরা তাই শিখে নেই।

ব্রাসেলস এর এক সম্ভ্রান্ত ফ্লেমিশ বংশে আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার রূপকার ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস ১৫১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রাসেলস এর স্কুল, লোভেন এর কলেজ ও প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তাঁর সময়কালের সমাজের নৈতিক কাঠামো কেমন ছিল ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয় শতকে গ্রীসে জন্মেছিলেন গ্যালেন নামক একজন প্রভাবশালী চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব। অনেক সুখ্যাতি ছিলো তাঁর। তিনি তাঁর একটি বইতে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন যে- কুকুর, শুকর, ছাগল, খরগোশের সাথে মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন- সজ্জাপদ্ধতি, সংখ্যা একই রকম। গ্যালেনের এমন মন্তব্যের কথা জেনে অনেকের হাসি আসতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এখনও এদেশে অনেকে মনে করে দুজনে মানুষ হলেও নারীর ও পুরুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা সমান নয়। উদারবাদী বলে পরিচিত উচ্চশিক্ষিত অনেকে মনে করেন কথাটা সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক সত্যি অর্থাৎ নারী এবং পুরুষ পরস্পরের মধ্যে কোন এক জনের একটি বিশেষ হাড়ের আকৃতিতে নাকি পার্থক্য আছে। মহান গ্যালেনের ধারণাকে সত্য মনে করে নিয়ে ডাক্তারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে এ্যানাটমি শেখাতেন। কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোস, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীর ব্যবচ্ছেদ করে ছাত্রদেরকে মানুষের শরীরের অঙ্গ সংস্থান বোঝাতেন। সেকালের কুসংস্কার এতো প্রবল ছিলো যে মৃত মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করা নৈতিক দিক থেকে মহাঅপরাধ বলে বিবেচনা করা হতো। অর্থাৎ গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখানো হতো যে মানুষের শরীরের হাড়ের সংস্থানের সাথে কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোশ, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীরের হাড়ের গঠন-সন্নিবেশ ও প্রত্যঙ্গ সজ্জার কোন অমিল নেই।
১৫৩৩ সালের শরৎকালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলজিয়াম থেকে একটি নতুন ছাত্র আসে। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নামডাকওয়ালা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ডাক্তারী শেখার জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। সেখানকার এনাটমী শিক্ষা গ্যালেন প্রভাবেব বাইরে নয়, তবুও শুধু নামের কারণেই ছাত্র সংখ্যার কোন কমতি ছিল না। বেলজিয়াম থেকে আসা ছাত্রটির নাম ভেসালিয়াস। তিনি এনাটমীর ক্লাশে শুকর-কুকুরের ব্যবচ্ছেদ দেখতে দেখতেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেনÑ গ্যালেনের বক্তব্যে নিশ্চয় ভুল আছে। হাজার বছর ধরে প্রচলিত বিশ্বাস এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ভেসালিয়াসের ছিলো। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ এখনও তাঁর সংগ্রহ করা হয়নি। তাই তিনি প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এর মধ্যে একদিন তিনি তাঁর এই ধারণার কথাটা প্রকাশ করলেন। বন্ধুরা কেউ কেউ হেসেছিলো, কেউবা পাগল বলে ব্যঙ্গ করেছিলো। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা প্রচন্ড খেপে গেলেন। ভেসালিয়াসকে মিথ্যাবাদী, পাগল, পাপী ইত্যাদি বলে বেড়াতে লাগলেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শারীরিক আঘাতের হুমকীও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভেসালিয়াস বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতেন। তাই পরাজয় স্বীকার করেননি। অপেক্ষা করছিলেন একটি যথার্থ প্রমাণের। সম্পূর্ণ মানব কংকাল হলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু লাশ ব্যবচ্ছেদ করা সামাজিক আইন অনুযায়ী অনৈতিক ও অন্যায়। তা অপরাধ বলে শাস্তিযোগ্য। তাই সেদিকে যাওয়া ভেসালিয়াসের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। অভাবিতভাবেই একদিন হঠাৎ করে তিনি একটি সম্পূর্ণ কংকাল পেয়ে গেলেন। সেকালে সমস্ত ইউরোপে ফাঁসীতে আসামীদের হত্যা করা একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি ছিলো। শহরের বাইরে এক নির্জন পাহাড়ী এলাকায় আসামীদেরকে ফাঁসী দেয়া হতো। ভেসালিয়াস একদিন বৈকালিক ভ্রমণ করতে করতে চিন্তামগ্ন অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশে ফাঁসী দেয়ার জায়গাটায় চলে এলেন। দেখলেন দুই এক মাস আগে ফাঁসী দেয়া এক আসামীর শুকনো কংকালটি ফাঁসী মঞ্চের পাটাতনে পড়ে আছে। লোকজনের চোখ এড়িয়ে কয়েকরাত ধরে বহন করে তিনি সম্পূর্ণ কংকালটি নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। জীবনে কখনো মানুষের কংকাল না দেখা ভেসালিয়াস একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ শুরু করে দিলেন। অনেক পরিশ্রম করে হাড়গুলো ধাতব তার দিয়ে জোড়া দিয়ে একটি সম্পূর্ণ মানব কংকাল সাজিয়ে ফেললেন। সম্পূর্ণ সাজানো কংকালটির দিকে তাকিয়ে ভেসালিয়াস বুঝে ফেললেন এতদিন যা শিখেছেন তা মোটেও সত্য নয়। এতকালের ধারণা-বিশ্বাস, শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতি, সামাজিক সমর্থন সবগুলোই মানুষের হাড়সজ্জা বিষয়ে সম্পূর্ণ কল্পনাশ্রয়ী ও অপপ্রচার মাত্র। মানুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা, গঠন ও সন্নিবেশ পদ্ধতির সঙ্গে গ্যালেন বর্ণিত কুকুর-শিয়াল প্রভৃতি প্রাণীর হাড় সংস্থানের কোন মিল নেই। সামাজিক চাপ এতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও হিংস্র ছিলো যে গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে ভেসালিয়াস পর্যন্ত জন্ম নেয়া অসংখ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী এই সাধারণ তথ্যটুকুই এতদিন আবিষ্কার করতে পারেননি। ভেসালিয়াসের অমর আবিষ্কারের কারণেই আমরা জানি মানুষের হাড়ের চাইতে পশুর হাড়ের সজ্জার যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে, জানি নারী ও পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই। উভয়েরই ২০৬টি করে হাড় রয়েছে। এমনকি দুজনের কোন একটি বিশেষ হাড়েও কোন বিকৃতি নেই।
Read More ...