Showing posts with label চিকিৎসাবিজ্ঞান. Show all posts
Showing posts with label চিকিৎসাবিজ্ঞান. Show all posts

Tuesday, May 6, 2008

আজ বিশ্ব এ্যাজমা দিবস


আজ বিশ্ব এ্যাজমা দিবস। এ্যাজমা সম্পর্কে সারাবিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই দিনটির প্রস্তাবনা। বিভিন্ন প্রভাবকের কারণে শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে লালার(Mucus) পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে শ্বাসনালীর ভিতরের আয়তন সংকুচিত হয়ে যায়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। রোগী হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিতে থাকে। একেই এ্যাজমা বলে। বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলে যেরকম পরিবর্তন হচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন আগামী দিনে সারা পৃথিবীতেই এ্যাজমা রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণ এর অন্যতম কারণ।

বিশ্বের এ্যাজমা রোগীদের মধ্যে প্রত্যেক ২৫০ জনে মারা যায় ১ জন। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ এ্যাজমারোগে আক্রান্ত। এবারের এ্যাজমা দিবসের শ্লোগান হল 'আপনার এ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আপনিই'। আসলেই তাই। নিজেই যদি একটু সচেতন থাকা যায় তাহলে এ্যাজমার আক্রমণ থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়।

১৯৯৮ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় প্রথম এ্যাজমা রোগ বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সঙ্গে ওই বছরই ৩৫টিরও বেশি দেশে প্রথম বিশ্ব এ্যাজমা দিবস উদযাপিতহয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর এ্যাজমা (GINA) এর যৌথ উদ্যোগে দিনটি পালিত হয়। (GINA) হল ন্যাশনাল হার্ট, লাঙ এবং ব্লাড ইনস্টিটিউটের সমন্বিত সহযোগিতায় গঠিত একটি প্রকল্প।
Read More ...

Friday, April 25, 2008

ম্যালেরিয়া দিবস

আজ ম্যালেরিয়া দিবস। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে হু এর ৬০ তম অধিবেশনে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস দিবস এর ধারণাটিকে গ্রহণ করা হয়।

ম্যালেরিয়া এখনও প্রান্তিক মানুষের কাছে মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসে। প্রত্যেক বৎসর ৩৫০ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং তার মধ্যে ১ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে মারা যায়। আফ্রিকাতে এই রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। সেখানে প্রত্যেক ৩০ সেকেন্ডে একজন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ম্যালেরিয়া রোগকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া এখনও সদর্পে তার রাজত্ব বিস্তার করেই চলেছে। বিশেষত সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন দেশগুলো ম্যালেরিয়ার অবাধ রাজত্বের জন্য উপযোগী। ৫ বৎসর বয়সের কম শিশু ম্যালেরিয়ার আক্রমণের প্রধান শিকার। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েরা মারাত্মক রকমের রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকে।

রুয়ান্ডা, ঘানা, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, সেনেগাল, নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা, মালি প্রভৃতি দেশের সরকার ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউনিসেপ ও হু এর সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

রুয়ান্ডা, ঘানা, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, সেনেগাল, নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা, মালি প্রভৃতি দেশের সরকার ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউনিসেপ ও হু এর সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধে ঘানা একটি দারুণ কার্যকরী উপায় বের করেছে। তারা বসতবাড়ির চারপাশে নিম গাছ লাগিয়েছে। এছাড়াও নিমের পাতা চায়ের মত গরম জলে ফুটিয়ে সপ্তাহে একবার পান করলে লিভারকে সুস্থ রাখা যায়।

পাশের ছবির কমলা রঙের দেশগুলিতে ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
ছবি: www.rollbackmalaria.org
Read More ...

Monday, March 31, 2008

শিশুরা আরও বলতে চায়

শিশুরা আরও বলতে চায়

সুশান্ত বর্মন

পূর্ণবয়স্ক নারী পুরুষমাত্রই স্বপ্ন দেখে একটি শিশুর। প্রধানত এজন্যই মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। বহুদিনের স্বপ্ন যখন বাস্তবে পরিণত হয় তখন পিতামাতার আনন্দের সীমা থাকে না। আনন্দের প্লাবনে তাদের পৃথিবী উপচে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে পুষ্পকলির মত শিশু বেড়ে ওঠে। ১ দিন ২ দিন করে পার হয় আর শিশুর শরীর বাড়তে শুরু করে। তারপর অর্থহীন কিছু শব্দ দিয়ে প্রকাশ করে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এই পর্যায়ে কিছু অতিরিক্ত মনোযোগের খুব দরকার।

লক্ষ্য করা যায় যে শিশু কথা বলা যখন শিখে যায় তখন যে প্রচুর কথা বলে। চারপাশের অচেনা জগতকে চিনে নেবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় সে প্রশ্ন করা শুরু করে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অজস্র প্রশ্ন এসে তার মগজে জমা হয়। ঘনিষ্ঠজনকে প্রশ্ন করে জেনে তৃপ্ত করতে চায় তার নতুন কৌতুহল। কিন্তু বড়রা বেশিরভাগ সময় এটা মেনে নিতে পারে না। শিশুর কৌতুহলপ্রবণতাকে ধমকের আঘাতে সঙ্কুচিত করতে চায়। শিশু বাধ্য হয় চুপ করতে। অজানাকে জানার স্পৃহা তার ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পরে। বিপরীতে কিছু কিছু জন্ম হয় বাকশক্তিহীন হয়ে। জন্ম থেকে তাদের শারীরবৃত্তিয় একাধিক কারণে তারা কথা বলতে পারেনা। এর মধ্যে প্রধান কারণ হল কানের সমস্যা। দেখা গেছে কানের কোন জন্মগত ত্রুটির কারণে কথা বলতে না পারা শিশুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কানের ত্রুটির কারণে তারা পরিপার্শ্বের কোন শব্দ শুনতে পারেনা। তাদের পৃথিবী হয়ে পরে শব্দহীন, নীরব নিথর। শব্দকে চিনতে না পারার কারণে তারা কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না বা চায় না।

শিশুর কথা বলার ইচ্ছা বা নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের কাছে বাচালতা হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে তার অর্থ ভিন্নরকম। কারণ শিশু কিভাবে কথা বলা শেখে বা ভাষা আয়ত্ব করে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্যের পরিমাণ খুব কম। শব্দময় এই জগতে একটি শিশু ঠিক কিভাবে নতুন শোনা শব্দকে হৃদয়ঙ্গম করে কিংবা নিজের মগজে কিভাবে একটি শব্দকে অনুধাবন করে এ বিষয়টা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও দুর্বোধ্য।

বধির শিশুদেরকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা শিশুদের ভাষার উপর দখল লাভের প্রচেষ্টাকে গভীর মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। যে সমস্ত শিশু কানের সমস্যার কারণে বধির হয়ে যায়, তাদের কেউ কেউ ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করলে সুস্থ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট কম্ব রিলে হাসপাতালের বিজ্ঞানীরা শ্রবণসক্ষমতার মাধ্যমে শিশুর ভাষাদক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাদের প্রধান অনুসন্ধানের বিষয় হল - শুনে শুনে কিভাবে একটি শিশু ভাষার উপর দখল প্রতিষ্ঠা করে? এর সাথে সাথে আরো কিছু প্রশ্ন বিজ্ঞানীদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভাষা আয়ত্ব করার পদ্ধতি তাদের কিরূপ? চারপাশের বিচিত্র ধ্বনিগুলো কিভাবে তাদের বোধগম্য হয়? একজন সুস্থ শিশুর মত ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা শিশু কি একই রকমভাবে বিভিন্ন শব্দের পার্থক্য বুঝতে পারে? শিশুরা যা দেখে তার সাথে শোনা শব্দকে কিভাবে তারা মিলিয়ে নেয় বা আলাদা করে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা হলে গবেষকরা শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের অগ্রগতিকে আরো ভালভাবে বুঝতে পারবেন। যাদের কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে কিংবা যাদের স্পিচ থেরাপি দেয়া হচ্ছে তাদের চিকিৎসার অগ্রগতি পরিমাপ করা আরও সহজ হবে।

সদ্যজন্ম হওয়া একটি শিশুর কাছে এই জগৎটা বিস্ময়কর। দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তুই সে চিনে নিতে চায়। এজন্য সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বস্তুটিকে চিনে চিনে চায়। শিশুর এই সহজাত আচরণটি বিজ্ঞানীদের প্রধান কৌতুহলের বিষয়। বিজ্ঞানীরা বলেন - শিশুর চোখের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করলে তার ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি বোঝা সহজ হবে। এই একটি বিষয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে আমরা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারব।

বিভিন্নরকম উদ্দীপক যেমন: শব্দ বা আলো ইত্যাদি শিশুকে সহজে আকৃষ্ট করে। এ ধরণের উদ্দপনাতে শিশু তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়। তারা বিভিন্নরকম শব্দকে কিভাবে আলাদা করে এবং এই সাফল্য তাদের ভাষা শিক্ষায় কিরকম প্রভাব ফেলে তা বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করতে পেরেছেন। কোন একটি নির্দিষ্ট বস্তুর দিকেএকটি শিশু কখন বা কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল তার উপর এই পরিমাপ পদ্ধতি নির্ভর করে। একটি সহজ পরীক্ষা দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পিতা অথবা মাতার সাথে শিশুকে একটি অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছে। তাদের সামনে রয়েছে বড় পর্দার টিভি। টিভির উপরে লুকানো আছে একটি ক্যামেরা। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে ৫ থেকে ১৩ মাস বয়সী শিশুরা তাদের সামনে থাকা মহিলার মুখের দুইরকম প্রতিচ্ছবি দেখে। দুইরকম প্রতিচ্ছবিতর উচ্চারিত শব্দ দুইরকম হবে না কি একটিমাত্র শব্দ হিসেবে শিশু গ্রহণ করবে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এতদিন সংশয়ে ছিলেন। যদি সঠিকভাবে ঠোঁট নাড়ানোর উপর শিশুর ভাষা শিক্ষার বিষয়টি নির্ভর করে তারপরও বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে এই সমস্যার উত্তর রয়েছে শিশুর চোখে।

আর একটি পরীক্ষায় দীর্ঘক্ষণ ধরে শিশুকে লাল ও সাদা ডোরাকাটা প্যাটার্ন দেখানো হয়েছে। এর পাশাপাশি একবার বিভিন্নরকম শক্দ শোনানো হয়েছে আবার কখনও কোন শব্দ শোনানো হয়নি। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে সুস্থ শ্রবণশক্তির শিশুরা মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দের প্রতি বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্নরকম শব্দের মধ্যে মানবীয় শব্দকে আলাদা করতে পারে। কিন্তু কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপিত শিশুদের ক্ষেত্রে ফলাফল কিছুটা ভিন্নরকম। তারাও বিভিন্ন শব্দের পার্থক্য ধরতে পারে তবে তার জন্য কিছুটা সময় ব্যায় করতে হয়। ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করার সাথে সাথে তারা শব্দ চিনতে পারেনা। এর জন্য এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে জন্ম থেকে কানে শোনেনা এমন শিশুদের সাথে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের মৌলিক পার্তক্য কোথায় তার কার্যকারণ অনুসন্ধান বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও জটিল বিষয়। তারা বিভিন্ন রকম ছবি, শব্দ ও উদ্দীপক ব্যবহার করে সমস্যাটির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই গবেষণাকর্মের প্রধান ড. ডেরেক এম হাউস্টোন বলেন - সাধারণ শিশুরা হঠাৎ করে হওয়া শব্দের উৎসের দিকে সরাসরি তাকায়। কিন্তু যারা বধির হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেছে কিংবা যাদের কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে তাদের আচরণ এক্ষেত্রে ভিন্নরকম। একই রকম হঠাৎ করে হওয়া শব্দ তাদের মনে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। শিশুদের ভাষা শিক্ষার কৌশল বোঝার সাথে সাথে এই সমস্যাটিও আমরা বুঝতে চাই।

শিশুর ভাষা শিক্ষা গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা অন্য আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ অভিনিবেশ সহকারে কাজ করে যাচ্ছেন। শিশুদের ভাষা আয়ত্ব পদ্ধতিকে অনুধাবনের বিষয়ে পিতামাতাদের কতটা আগ্রহ বা মনোযোগ আছে এটা বিজ্ঞানীরা জানতে চান। ড. হাউস্টোনের সহকারী গবেষক ড. বেরগেসন বলেন - আমাদের এ বিষয়ে আরেকটি প্রজেক্ট আছে। আমরা জানতে চাই মায়েরা ঠিক কেন স্বত:প্রণোদিত হয়ে শিশুদের সাথে কথা বলে। মজার ব্যাপার হল যে সব শিশুদের ককলিয়ার ইমপ্লান্ট করা হয়েছে তাদের শ্রবণ বয়সের (Hearing age) দিকে মায়েরা খেয়াল রাখে। কতদিন আগে শিশুর কানে অস্ত্রপোচার করা হয়েছিল তার উপর শ্রবণ বয়স নির্ভর করে। বিজ্ঞানীদের আবিস্কৃত পন্থায় ১২ মাস আগে কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল এমন ২০ মাস বয়সী শিশুর শ্রবণ বয়স হল ১ বৎসর। এ ধরণের শিশুর সাথে তাদের মা যখন গল্প করে তখন শ্রবণবয়সটার কথা তাকে মনে রাখতেই হয়। না হলে শিশুর সাথে যোগাযোগ ঠিকভাবে স্থাপন করা যায় না। এটা মায়েরা তাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে অনুভব করে। গবেষণাকার্য চলাকালে অবুঝ শিশুরা/ দুগ্ধপোষ্য শিশুর (Infants and toddlers) কি বলতে চায় তা ড. হাউস্টোন ও বেরগেনসন গভীর মনোযোগের সাথে শুনেছেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছেন শিশুরা কিছু একটা বলতে চায়। যে শব্দটি তারা শিখেছে তা তারা বলতে চায়। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শেষে গবেষকরা একটি সিদ্ধান্তে এসেছেন। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন - শিশুর উচ্চারিত শব্দগুলি সাধারণ শিশুতোষ শব্দের চাইতেও অনেক বেশি। আমাদের দৃষ্টিতে তার কোন অর্থ নাও থাকতে পারে কিন্তু শিশুর কাছে তা তার মর্মোচ্চারণ। সে বড়দের মত নিজেও কিছু বলতে চায় এবং নিজের ভাষায় তা সে বলে। যা আমরা মূল্যায়ন করি না।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন বড়রা যদি শুধুমাত্র একটুখানি ধৈর্য ধরে শুনতো তাহলে শিশুরা অনেককিছুই বলতো। তারা বলতে চায়। শ্রুত শব্দকে তাদের নিজের মত করে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে চায়। বড়রা যদি শিশুদের কথার প্রতি ভালো শ্রোতা হত তাহলে তাদের ভাষাশিক্ষার গতি অনেক বেড়ে যেত। ভাষাকে আয়ত্ব করার সামর্থ বেড়ে যেত কয়েকগুণ।
Read More ...

Monday, March 17, 2008

ইমেজ এওয়ার্ড ০৮ - ৪

চিনির দানার উপর একটি মাছি। Credit Annie Cavanagh

রক্তের লোহিত কণা। Credit Annie Cavanagh

কৃতজ্ঞতা: welcomecollection
Read More ...

ইমেজ এওয়ার্ড ০৮ - ৩

ইদুরের ভ্রুণ। ১১.৫ দিন বয়সী এই ভ্রুণটির স্নায়ুতন্ত্রকে সবুজ রঙে এবং হৃদপিন্ডটিকে লাল রঙে দেখানো হয়েছে। Credit: MRC Human Genetics Unit.

ভিটামিন সি এর কৃষ্টাল। ভিটামিন সি মানুষের কোষগুলোকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। Credit: MI Walker.

কৃতজ্ঞতা: welcomecollection
Read More ...

ইমেজ এওয়ার্ড ০৮ - ২

Clostridium difficile এই ব্যাকটেরিয়াটি ডায়রিয়ার জন্য দায়ী Credit: Annie Cavanagh.

HIV এই ভাইরাসটি সম্পর্কে সবাই জানেন। এইডস রোগের কারণ।
কৃতজ্ঞতা: welcomecollection
Read More ...

ইমেজ এওয়ার্ড ২০০৮-১

১২ মার্চ ২০০৮ তারিখে Wellcome Trust এর পক্ষ থেকে image awards 2008 প্রদান করা হয়েছে।
বেশ কিছু বিস্ময়কর ও চোখ ধাধানো ছবি পুরস্কার পেয়েছে। এখানে পুরস্কারপ্রাপ্ত কয়েকটি ছবি নিচে প্রদর্শিত হল:-
স্তন ক্যান্সার Credit: Annie Cavanagh

ভেঙে যাওয়া রক্ত নালী। Credit: Anne Weston.

কৃতজ্ঞতা: welcomecollection
Read More ...

Thursday, March 6, 2008

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ২

মানুষের কংকাল বিষয়ে হাজার বছরের প্রচলিত বিশ্বাস এর বিপরীতে ভেসালিয়াসের এই আবিষ্কার সারা ইউরোপে দারুণ সাড়া ফেলে দিলো। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় দেয়া বক্তব্যে ভেসালিয়াস সেই অপরাধীর কংকাল আবিষ্কার এর বিষয়টি উল্লেখ করে বলতেন- আমি যদি গভীর রাতে কংকাল দেখে আধিভৌতিকতাকে বিশ্বাস করে ভয় পেতাম তাহলে আজ সত্যকে চিনতে পারতামনা। যদি মহান গ্যালেনকে ধ্রুবসত্য বলে বিশ্বাস করতাম তাহলে আজ জানা হতো না বৈজ্ঞানিক সত্যটি। বন্ধু ক্যালকার এর আঁকা ছবি ও নিজের পর্যবেক্ষণজাত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা উপস্থাপন করে ভেসালিয়াস তাঁর নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তুললেন। নিখুঁত চিত্র ও বিস্তারিত তথ্যে বেশিরভাগ জনগণ নিজেদের বিশ্বাসের সাথে বৈজ্ঞানিক সত্যের পার্থক্য বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা নিজেদেরকে বোকা ভাবতে চাইলেন না। তাই বাড়িতে ঢিল, রাস্তায় হুমকী, মারধর ইত্যাদি সহিংস পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ভেসালিয়াসকে বিরক্ত করতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে ভেসালিয়াস প্যারিস ছেড়ে ইটালিতে চলে এলেন। ইটালির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে ইটালি অনেকটা উদার ও সহনশীল সমাজ তৈরি করতে পেরেছিলো। রক্ষণশীলতার বন্ধ কপাট ইটালিতে অনেকাংশেই খোলা ছিলো। সেখানকার কর্তৃপক্ষ প্রাচীন পুস্তককেই একমাত্র সত্যি কথা বলে বিশ্বাস করতে নারাজ ছিলেন বলেই মেধাবী গবেষকদের কাছে ইটালি দেশটির একটি আলাদা মর্যাদা ছিলো। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমির অধ্যাপক পদে ভেসালিয়াস নিযুক্ত হন মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে, ১৫৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে।
ভেসালিয়াস বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এভাবে চিরকাল বক্তৃব্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই যদি একটি বই লেখা যেতো তাহলে খুব ভালো হতো। পাদুয়ায় শিক্ষকতা ও গবেষণার আঁকে ফাঁকে কয়েক বছরের নিরলস চেষ্টার পর একটি গ্রন্থ লেখা সম্পূর্ণ করলেন। সমকালীন নীতিবাদীদের অনেক বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে প্রকাশিত হওয়া গ্রন্থটির নাম- ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’। বাংলায় ‘মানব দেহের অঙ্গসংস্থান’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি একটি বিশাল স্থান গ্রহণ করে আছে। মানব শরীরের অভ্যন্তরস্থ প্রত্যঙ্গগুলো সম্পর্কে এটাই প্রথম যথাযথ বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ। মানুষের হাড়, মাংশপেশী, প্রত্যঙ্গের গঠন, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সম্পর্কে নিখুঁত আলোচনা ও বন্ধু ক্যালকার-এর আঁকা চিত্র প্রাচীন বিজ্ঞানের অনেক মীথ ভেঙে ফেলেছে। তাঁর আলোচনা পদ্ধতি ছিলো সরল ও প্রাণবন্ত। তাঁর বর্ণনাপদ্ধতি এখনও আধুনিক শারীরবিদদের পথ প্রদর্শন করে চলেছে। হাড়, পেশী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও ক্যালকার এর আঁকা প্রামাণ্য চিত্র দিয়ে ভেসালিয়াস গ্যালেনপন্থীদের অবস্থান দূর্বল করে দিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ভেসালিয়াসের কীর্তিতে সমৃদ্ধ হলেও কতিপয় ব্যক্তিবর্গের মন তুষ্ট হয়নি। ভেসালিয়াস তাঁর ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটি প্রকাশের কাজ তদারক করতে একদিন ইটালি ছেড়ে বেলজিয়ামে যান। প্রিয় ও মেধাবী ছাত্রটিকে তাঁর অবর্তমানে কাজ চালিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। কয়েক দিন পর ফিরে এসে দেখেন তাঁর প্রিয় ছাত্রটি কূটবুদ্ধি ও গ্যালেনপন্থীদের সাথে ভালো যোগাযোগের সুযোগে নিজ অবস্থান পাকা করেছে। ছাত্রটি তাঁর মেধাবী কর্মকৌশলে ভেসালিয়াসকে সরিয়ে নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেবার কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেসালিয়াসের সাথে কোন কথা বললেন না; তাঁর দেয়া কোন যুক্তিকেই তাঁরা বহন করলেন না। অপমানিত ভেসালিয়াস দারুণ লজ্জায় নিজেকেও গুটিয়ে নিলেন। তাঁর এতদিনের গবেষণা-পড়াশোনা নিজের কাছেই ভুল বলে মনে হতে লাগলো। যে মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর এত চেষ্টা তার কোন মূল্যই চারপাশের মানুষরা গ্রহণ করতে পারছে না দেখে তিনি প্রচণ্ড হতাশা বোধ করলেন। আসলে ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি তাঁর সমকালের তুলনায় অনেক অগ্রগামী চিন্তার মানুষ ছিলেন। হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য অযথা আর চিন্তা করবেন না। সম্রাট চার্লস এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নতুন কাজে যোগ দিলেন। এতদিনের দরিদ্রতা নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। রাজার সংস্পর্শে এসে মুহূর্তেই তার অনেক টাকা উপার্জিত হয়ে গেল। ফ্রান্সের সবচেয়ে অভিজাত ব্যক্তিবর্গের মাঝে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফ্রান্সের বেশ খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন। বর্ণাঢ্য জীবন আর মোহনীয় নারীদের মাঝে সারাক্ষণ বাস করলেও ভেসালিয়াসের মন পড়ে থাকতো পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। কিন্তু ফিরে যাবার পরিবেশ ছিলো না আর। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই তিনি হাস্যপ্রিয় নারীদের কোলাহলে মিশে যেতেন। সমাজনেতা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূর্খতার প্রভাবে এভাবেই একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অপমৃত্যু হলো।
বিশ বছর পরে পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক গাব্রিয়েল ফেলোপিয়াস বুঝতে পারেন মানব শরীর বিষয়ক সত্য তথ্যটি। তিনি গ্যালেনের তথ্যের অসারতা ও ভেসালিয়াসের যথার্থতা প্রমান করে ও ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ গ্রন্থটির প্রভূত প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। একটি চিকিৎসা বিষয়ক ম্যাগাজিনে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। সবাই নতুন করে ভেসালিয়াসকে বিচার করতে চাইলেন। তরুণ ডাক্তাররা সবাই আধুনিক ও কুসংস্কারমুক্ত মনের ছিলো। তারা অনেকেই নিজে নিজে গোপনে পরীক্ষা করে দেখে গ্যালেনের দেয়া ভুল তথ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলো। প্রশাসন ও নীতিবাদীদের নির্যাতনের ভয়ে এতকাল চুপ থাকলেও এখন তারা কোন বাধা মানলো না। অপেক্ষাকৃত মুক্ত মনের নতুন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্বতনদের সিদ্ধান্তের অসারতা বুঝতে পারলেন। তাঁরা ভেসালিয়াসকে পূর্বপদে পুনর্বহাল করে চিঠি দিলে তিনি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। মূর্খ প্রবীণদের ভুল তরুণরা বুঝতে ও সংশোধন করতে চাইছে জেনে তিনি আশান্বিত হন। ফিরে আসতে চাইলেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আসার পথে এক শক্তিশালী ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে তিনি সহ জাহাজের সমস্তু যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। অনেক খোঁজাখুজি করেও জাহাজের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর তীর্থযাত্রীদের একটি জাহাজ সামুদ্রিক ঝড়ে দিকবিভ্রান্তির ফলে চলে আসে ‘জান্তে’ নামক একটি দ্বীপে। ঝড় থামলে তীর্থযাত্রীদের সবাই দ্বীপের বালুতটে একটি জাহাজের ভগ্নাংশ ও বেশ কয়েকটি কংকাল দেখতে পেলেন। সবাই একটি লাশের পাশে দেখলেন ‘ডি ফ্যাব্রিকা করপোরিস হিউম্যানি’ নামক গ্রন্থটি। তাদের মধ্যে কারও কারও গ্রন্থটি পড়া ছিলো। তারা উপকূল থেকে একটু উচু জায়গায় ভেসালিয়াসের কংকালটি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখলেন। একটি কাঠে তাঁর নাম লিখে মাথার কাছে পুঁতে রাখলেন।
এক তরুণ বিজ্ঞানসচেতন ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী বিজ্ঞানী ভেসালিয়াস তাঁর চারপাশের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের চাইতে এক পা এগিয়ে ছিলেন। সময়ের চাইতে অগ্রগামী এই ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞাকে তাই তাঁর সমাজের নেতারা বুঝে উঠতে পারেননি। এখনকার মতো সেকালেও সব সামাজিক নেতারা জনগণকে নিজেদের চাইতে মূর্খ ভাবতেন। তাই ভেসালিয়াসের প্রজ্ঞাকে তাঁরা মাপতে পারেননি। বুঝতে পারেননি এই অমর চিকিৎসাবিজ্ঞানীর যাথার্থ। কিন্তু সত্য তথ্য যা তা কখনও চাপা থাকেনি। কুসংস্কারবাদী শক্তিমানদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বিফল প্রমাণিত করে আমরা নিজেরাও আজ জানি যে মানুষের হাঁড়ের বিন্যাস, পেশী সংস্থান, বিভিন্ন অঙ্গের গঠনের সাথে কুকুর-শুকরের হাঁড় বিন্যাস, পেশী সংস্থান বা বিভিন্ন অঙ্গের গঠন বা কার্যাবলীর কোন মিলই নেই। এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশ্বাসকে আঘাত করে করুক তাতে সত্য বসে থাকেনি। বিশ্বাসবাদী গ্যালেনপন্থীরাই যে ভুল ছিলো তা আজ আর কোন ভীততথ্য নয়। এখন শিশুরাও জানে যে নারী-পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই; কারও কোন বিশেষ হাঁড়ও বিকৃত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতদিন বিজ্ঞান সম্মত থাকবে, যদি চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনো বিশ্বাস নির্ভরতার পাতা ফাঁদে পা না দেয় তাহলে চিরকাল প্রশংসার সাথে স্মরণ করবে ‘আধুনিক এনাটমী শাস্ত্রের জনক’ ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস এর অমর কীর্তিকে।
Read More ...

আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার কাহিনী ১

ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস

সুশান্ত বর্মন

বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান। যা অন্যসব জ্ঞানের মতো নয়। যে জ্ঞান আমাদেরকে এগিয়ে দেয়। মনের কঠিন অন্ধকার দূর করে, দিগন্ত আলোকিত করে। আমাদের মুখোমুখি করে দারুণ সত্যের। আমাদের শতচর্চিত ধারণা বা বিশ্বাসগুলো ভয় পায় বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের সগৌরব যাত্রাপথে নানা বিঘ্ন ঘটাতে চায় এবং ঘটায়। তবুও বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। নানা আক্রমণের মুখেও মহাকাশবিদ্যা, জীববিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের একাধিক শাখা সমাজের মূর্খ নেতাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করেছে। সত্য প্রকাশের দায়ে নির্যাতিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সক্রেটিস, ব্রুনো প্রমুখের নাম চিরস্মরণীয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চাইতে সামাজিক নীতির হাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। কখনও কখনও বিজ্ঞান ও ধর্ম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। কখনও একটি অসাধারণ তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে হঠাৎ করে এসে গেছে, কখনও কোন একটি জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে অভাবিতভাবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনি অনেক ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিজ্ঞান যে কখনও কোন পুরনোবাদীর ইচ্ছার কাছে থেমে থাকেনি এইসব ঘটনার কাছ থেকে আমরা তাই শিখে নেই।

ব্রাসেলস এর এক সম্ভ্রান্ত ফ্লেমিশ বংশে আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার রূপকার ডা: অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস ১৫১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রাসেলস এর স্কুল, লোভেন এর কলেজ ও প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তাঁর সময়কালের সমাজের নৈতিক কাঠামো কেমন ছিল ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয় শতকে গ্রীসে জন্মেছিলেন গ্যালেন নামক একজন প্রভাবশালী চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব। অনেক সুখ্যাতি ছিলো তাঁর। তিনি তাঁর একটি বইতে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন যে- কুকুর, শুকর, ছাগল, খরগোশের সাথে মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন- সজ্জাপদ্ধতি, সংখ্যা একই রকম। গ্যালেনের এমন মন্তব্যের কথা জেনে অনেকের হাসি আসতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এখনও এদেশে অনেকে মনে করে দুজনে মানুষ হলেও নারীর ও পুরুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা সমান নয়। উদারবাদী বলে পরিচিত উচ্চশিক্ষিত অনেকে মনে করেন কথাটা সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক সত্যি অর্থাৎ নারী এবং পুরুষ পরস্পরের মধ্যে কোন এক জনের একটি বিশেষ হাড়ের আকৃতিতে নাকি পার্থক্য আছে। মহান গ্যালেনের ধারণাকে সত্য মনে করে নিয়ে ডাক্তারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে এ্যানাটমি শেখাতেন। কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোস, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীর ব্যবচ্ছেদ করে ছাত্রদেরকে মানুষের শরীরের অঙ্গ সংস্থান বোঝাতেন। সেকালের কুসংস্কার এতো প্রবল ছিলো যে মৃত মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করা নৈতিক দিক থেকে মহাঅপরাধ বলে বিবেচনা করা হতো। অর্থাৎ গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখানো হতো যে মানুষের শরীরের হাড়ের সংস্থানের সাথে কুকুর, বিড়াল, শুকর, খরগোশ, ছাগল, শেয়াল ইত্যাদি প্রাণীর শরীরের হাড়ের গঠন-সন্নিবেশ ও প্রত্যঙ্গ সজ্জার কোন অমিল নেই।
১৫৩৩ সালের শরৎকালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলজিয়াম থেকে একটি নতুন ছাত্র আসে। সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নামডাকওয়ালা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ডাক্তারী শেখার জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। সেখানকার এনাটমী শিক্ষা গ্যালেন প্রভাবেব বাইরে নয়, তবুও শুধু নামের কারণেই ছাত্র সংখ্যার কোন কমতি ছিল না। বেলজিয়াম থেকে আসা ছাত্রটির নাম ভেসালিয়াস। তিনি এনাটমীর ক্লাশে শুকর-কুকুরের ব্যবচ্ছেদ দেখতে দেখতেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেনÑ গ্যালেনের বক্তব্যে নিশ্চয় ভুল আছে। হাজার বছর ধরে প্রচলিত বিশ্বাস এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ভেসালিয়াসের ছিলো। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ এখনও তাঁর সংগ্রহ করা হয়নি। তাই তিনি প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এর মধ্যে একদিন তিনি তাঁর এই ধারণার কথাটা প্রকাশ করলেন। বন্ধুরা কেউ কেউ হেসেছিলো, কেউবা পাগল বলে ব্যঙ্গ করেছিলো। কিন্তু গ্যালেনপন্থীরা প্রচন্ড খেপে গেলেন। ভেসালিয়াসকে মিথ্যাবাদী, পাগল, পাপী ইত্যাদি বলে বেড়াতে লাগলেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শারীরিক আঘাতের হুমকীও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভেসালিয়াস বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতেন। তাই পরাজয় স্বীকার করেননি। অপেক্ষা করছিলেন একটি যথার্থ প্রমাণের। সম্পূর্ণ মানব কংকাল হলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু লাশ ব্যবচ্ছেদ করা সামাজিক আইন অনুযায়ী অনৈতিক ও অন্যায়। তা অপরাধ বলে শাস্তিযোগ্য। তাই সেদিকে যাওয়া ভেসালিয়াসের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। অভাবিতভাবেই একদিন হঠাৎ করে তিনি একটি সম্পূর্ণ কংকাল পেয়ে গেলেন। সেকালে সমস্ত ইউরোপে ফাঁসীতে আসামীদের হত্যা করা একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি ছিলো। শহরের বাইরে এক নির্জন পাহাড়ী এলাকায় আসামীদেরকে ফাঁসী দেয়া হতো। ভেসালিয়াস একদিন বৈকালিক ভ্রমণ করতে করতে চিন্তামগ্ন অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশে ফাঁসী দেয়ার জায়গাটায় চলে এলেন। দেখলেন দুই এক মাস আগে ফাঁসী দেয়া এক আসামীর শুকনো কংকালটি ফাঁসী মঞ্চের পাটাতনে পড়ে আছে। লোকজনের চোখ এড়িয়ে কয়েকরাত ধরে বহন করে তিনি সম্পূর্ণ কংকালটি নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। জীবনে কখনো মানুষের কংকাল না দেখা ভেসালিয়াস একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ শুরু করে দিলেন। অনেক পরিশ্রম করে হাড়গুলো ধাতব তার দিয়ে জোড়া দিয়ে একটি সম্পূর্ণ মানব কংকাল সাজিয়ে ফেললেন। সম্পূর্ণ সাজানো কংকালটির দিকে তাকিয়ে ভেসালিয়াস বুঝে ফেললেন এতদিন যা শিখেছেন তা মোটেও সত্য নয়। এতকালের ধারণা-বিশ্বাস, শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতি, সামাজিক সমর্থন সবগুলোই মানুষের হাড়সজ্জা বিষয়ে সম্পূর্ণ কল্পনাশ্রয়ী ও অপপ্রচার মাত্র। মানুষের শরীরের হাড়ের সংখ্যা, গঠন ও সন্নিবেশ পদ্ধতির সঙ্গে গ্যালেন বর্ণিত কুকুর-শিয়াল প্রভৃতি প্রাণীর হাড় সংস্থানের কোন মিল নেই। সামাজিক চাপ এতই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও হিংস্র ছিলো যে গ্যালেনের মৃত্যুর পর থেকে ভেসালিয়াস পর্যন্ত জন্ম নেয়া অসংখ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী এই সাধারণ তথ্যটুকুই এতদিন আবিষ্কার করতে পারেননি। ভেসালিয়াসের অমর আবিষ্কারের কারণেই আমরা জানি মানুষের হাড়ের চাইতে পশুর হাড়ের সজ্জার যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে, জানি নারী ও পুরুষের হাড়ের সংখ্যায় কোন পার্থক্য নেই। উভয়েরই ২০৬টি করে হাড় রয়েছে। এমনকি দুজনের কোন একটি বিশেষ হাড়েও কোন বিকৃতি নেই।
Read More ...

Monday, March 3, 2008

ম্যালেরিয়া আবিষ্কারের কাহিনী

ম্যালেরিয়া আবিষ্কারের কাহিনী
সুশান্ত বর্মন

পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ানক প্রাণীটির নাম জানতে চাইলে অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে দেবেন। কেউ বলবেন বাঘের কথা, কেউ বা বলবেন ডাইনোসরের কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই ভয়ংকর প্রাণীটির নাম মশা। প্রাণী হিসেবে এটি খুবই ক্ষুদ্র; কিন্তু কাজে কর্মে প্রচন্ড ভয়ানক। ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধক বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হবার পূর্ব পর্যন্ত কত লোক যে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া বোধহয় কখনও সম্ভব হবে না। তবে এই উপমহাদেশে ইংরেজ আমলের এক বছরের হিসেবে দেখা যায় সে বছর মোট ১৩ লক্ষ লোক মারা গেছে এই ছোট প্রাণীটির আক্রমণে। প্রাচীন মানুষ যারা জ্ঞানে অল্প, বুদ্ধিতে হীন, অলৌকিকতায় বিশ্বাসী, নিয়তিবাদী তারা মশার হিংস্র আক্রমণে এতই বিপর্যস্ত ছিলো যে তাকে নিয়ে অসংখ্য গল্প রচনা করেছে। কোন কোন গল্পে দেখানো হয়েছে ছোট মশাটি হাতীর শুঁড় দিয়ে মগজে ঢুকে তাকে আঁচড়ে কামড়ে পাগল করে দিয়েছিলো। শারীরবিদ্যা না জানা ব্যক্তিদের পক্ষে এমন কথা ভাবাই সম্ভব যে নাক দিয়ে ঢুকে মগজে যাওয়া যায় না; কিন্তু এ ধরণের বিভিন্ন গল্প মূলতঃ মশার কর্মক্ষমতার সামনে মানুষের অসহায়তাকেই তুলে ধরে। মশার রক্তলোলুপ ক্ষমতার বিপরীতে অসহায় মানুষ এমন গল্পের সৃষ্টি করে সান্তনা পেতে পারে বৈকী; কিন্তু তাতে বাস্তব অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়না।
মধ্যযুগে ইউরোপে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ব্যাপক ছিলো। সেসময়ও ম্যালেরিয়া নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছিল কিন্তু বিশ্বাসবাদী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যা হয়; মশা সম্পর্কিত গবেষণাও তার বাইরে থাকেনি। বৈজ্ঞানিক নামের এক দল অনেক গবেষণা করে আবিষ্কার করলেন যে ম্যালেরিয়া রোগ হয় দূষিত বাতাস থেকে। তারা লক্ষ করলেন পঁচা ডোবা-পুকুর-নালা-জলাশয়-ঘিঞ্জি ঘর, স্যাঁতস্যাতে জায়গা ইত্যাদির পাশে বসবাসকারী ব্যক্তিরা এই রোগের সহজ শিকারে পরিণত হয়। তাই তারা ভাবলেন পঁচা জল থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস জাতীয় অসুস্থ্যতার মূল কারণ। এই মহা গবেষণা শেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন দূষিত বাতাসের কারণেই এই রোগ হয়। তাই তার নাম রাখলেন ‘ম্যালেরিয়া’ যার অর্থ ‘দূষিত বাতাস’।
১৮৮০ সাল। আলজিরিয়ার হাসপাতালে কাজ করেন লাভারেন নামের এক ফরাসী ডাক্তার। সে সময় আলজিরিয়াতে ম্যালেরিয়াতে প্রতিবছর হাজার হাজার লোক মারা যেতো। একদিন অনুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে কাজ করতে করতে কৌতুহলবশতঃ কয়েকজন ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত স্লাইডে নিলেন। অনুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ দিয়ে দেখতে পেলেন রক্তের মধ্যে কালো কালো অসংখ্য দানা দেখা যাচ্ছে। তিনি ভালো রক্তের সাথে তুলনা করে বুঝতে পারলেন এরাই ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু। তিনি এর সাথে মশার সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা ভাবলেন। তিনি ধারণা করলেন কোনভাবে হোক মশার দেহে এই জীবাণগুলো ঢোকে। তবে এ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারলেন না। কোন জাতের মশা এ ধরণের জীবাণুর বাহক; জীবাণুগুলো কিভাবে মশার শরীরে ঢোকে অথবা কিভাবেই বা মশাবাহী জীবাণুগুলো এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির শরীরে সংক্রামিত হয় সে বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য বা দিকনির্দেশনা দিতে পারলেন না। তিনি এই জীবাণুদের নাম রাখলেন ‘ম্যালেরিয়াল প্যারাসাইট’।
লাভারেন এর আবিষ্কারের কথা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে চারিদিকে সাড়া পড়ে গেলো। তার বক্তব্যকে ভিত্তি ধরে অনেকে গবেষণা শুরু করে দিলেন। এর মধ্যে ম্যানসন নামের এক ইংরেজ ডাক্তার এক নতুন কথা বললেন। তিনি জানালেন- যে ধরণের মশা জীবাণ বহন করে তারা আসলে ‘বিষাক্ত মশা’(?)। এই বিষাক্ত(?) মশারা যদি খাবার জল বা কোন খোলা খাদ্যে বসে তাহলে সেই খাবারটি বিষাক্ত হয়ে যায়। এমন বিষাক্ত খাবার যদি কোন সুস্থ্য ব্যক্তি গ্রহণ করে তাহলে তার শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণ প্রবেশ করে এবং সেও ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়। অভূতপূর্ব এই গবেষণা কর্মটির ফলে যে সিদ্ধান্ত বের হয়ে এলো তার নাম ‘দূষিত জল মতবাদ’। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বিশ্বাসের প্রতি প্রবল বিশ্বাস, পশ্চাৎপদতা ইত্যাদির প্রভাব মানবজীবনে কম নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে আমরা এর বাস্তব প্রমান খুব কাছাকাছি থেকে দেখি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাসে এরকম অজ্ঞতা ও বুদ্ধিহীনতার প্রমাণ মোটেই কম নয়। যুগে যুগে কালে কালে বিজ্ঞান নামের এমন অপবৈজ্ঞানিক চর্চার ধারা আজও থেমে থাকেনি। ম্যানসনের এই অসাধারণ আবিষ্কারের ফলে ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য জানা হয়ে গেছে বলে মনে করা হলো। ফলে নতুন কোন তথ্য আর আবিষ্কার হলো না।
ভারতীয় উপমহাদেশে তখন ইংরেজ শাসন চলছিলো। ভারতের হায়দ্রাবাদ রাজ্যের সেকেন্দ্রাবাদ শহরের এক ছোট হাসপাতালে কাজ করতেন সেনাবাহিনীর তরুণ ইংরেজ ডাক্তার মেজর রোনাল্ড রস। ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন। সমস্ত ছুটির সময়টা তিনি লন্ডনেই কাটাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। একদিন তিন দেখা করতে গেলেন ডা: ম্যানসনের কাছে। তিনি ডা: রসকে ডা: লাভারেন এর কথা জানালেন। বললেন তার নিজের ধারণার কথা। ডা: রসকে উৎসাহিত করে বললেন -‘ভারতবর্ষে ম্যালেরিয়া একটি অন্যতম সমস্যা। প্রত্যেক বছর সেখানে হাজার হাজার লোক ম্যালেরিয়ায় ভুগে মারা যায়। সেখানেই এ বিষয়ে গবেষণা করার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। তোমার গবেষণার প্রত্যক্ষ সুফল তাদেরই পাওয়ার অধিকার প্রথমে রয়েছে।’ ডা: রস ডা: ম্যানসনের কথা শুনে খুবই আশান্বিত হলেন। তিনি ভারতবর্ষের ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত সমস্যাটি জানেন। তিনি এটাও জানেন ভারতে কাজ করতে আসা প্রায় প্রত্যেক ডাক্তার এই নিয়ে গবেষণা করেছেন ও করছেন। অনেক রকমের অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষাও গবেষকরা করেছেন কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ম্যালেরিয়ায় মৃত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছিলো। পূর্ববর্তী গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে হাতে ছিলো শুধু কুইনাইন। কিন্তু তাও ততোটা কার্যকরী ছিলোনা। তাই কুইনাইন দিয়ে রোগীকে সাময়িকভাবে সুস্থ্য করাই শুধু যেতো। তাছাড়া গবেষকরাও নিশ্চিত ছিলেন না এই রোগের পিছনে মশার ভূমিকা কতটুকু আছে তা নিয়ে। কারণ কেউ নিশ্চিত করে জানতো না এ রোগের উৎপত্তি কোথায়; কেমন করেই বা তা একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের এই মহাকালিক অজ্ঞতার কারণে সারা পৃথিবীসহ সেকালে ভারতবাসীকে এক অন্তহীন আতংককে সাথে নিয়ে দিন কাটাতে হতো।
ছুটি শেষে ভারতে আসতে আসতেই ডা: রস তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ঠিক করে ফেললেন। জাহাজের ডেকে বসে বসে স্থির করে ফেললেন ম্যালেরিয়ার রহস্য তাকে ভেদ করতেই হবে। নতুন উদ্যমে ভারতে ফিরে এসে ডা: রস তার সেকেন্দ্রবাদের কর্মস্থলে য়োগ দিলেন। প্রথমে প্রতিদিন মশা ধরে আনার জন্য বেতনের ভিত্তিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে ঠিক করলেন। এদের নাম দিলেন ‘মসকুইটোম্যান’। তিনি ভেবেছিলেন ধরে আনা মশাগুলোকে দিয়ে ম্যালেরিয়াল প্যারাসাইট ভর্তি রক্ত গ্রহণ করাতে হবে। যদিমশাই ম্যালেরিয়া রোগের বাহক হয় তাহলে তাদের পেটে নিশ্চয় এই জীবাণুগুলোকে জীবন্ত পাওয়া যাবে। ভাবামাত্র ডা: রস কাজ শুরু করে দিলেন। একটি বন্ধ ঘরে একজন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে রেখে সেখানে কতগুলো মশা ছেড়ে দেয়া হলো। বেশ কিছুক্ষণ পর মশাগুলোকে আবার ধরে তিনি গবেষণাগারে নিয়ে এলেন। এরপর মশাগুলোর দেহ ব্যবচ্ছেদ করে তিনি অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। মাসের পর মাস ধরে তিনি এই অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। কিন্তু কোন ফল হলো না। তার এতদিনের পরিশ্রম যেন বিফল হযে যেতে লাগলো। তাই বলে তিনি নিরাশ হলেন না। কারণ মশা থেকেই যে এই রোগটা ছড়ায় এটা বৈজ্ঞানিকভাবে এতোদিনে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব মশার মাঝেই খুজতে হবে এর উৎস ও জীবন প্রবাহ। তিনি ভাবলেন হয়তো কোন পদ্ধতিগত ভুল হচ্ছে। তাই তিনি ভিন্ন পদ্ধতিতে এগোবার চেষ্টা করলেন। তিনি এবার নিজস্ব পদ্ধতি ছেড়ে ম্যানসনের দেয়া মতবাদ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। ম্যানসনের ‘দূষিত জল’ মতবাদ মাথায় রেখে তিনি একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করলেন। প্রথমে একটি কাঁচের বোতলে কিছু জল নিলেন। ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত গ্রহণ করেছে এমন কয়েকটি মশাকে সেখানে ছেড়ে দিলেন। এরপর বোতলটি একটি নিরাপদ স্যাঁতস্যাতে অন্ধকার জায়গায় রাখলেন। ৫/৬ দিন পর বোতলটিকে বের করলে দেখা গেল মশাগুলি সব মারা গেছে। কিন্তু কয়েকটি মশার লার্ভা জলের উপর ভাসছে। ডা: রস বুঝতে পারলেন আগের মশাগুলি এই জলের মধ্যে ডিম পেড়েছিলো। সেই ডিম ফুটেই লার্ভাগুলি বের হয়েছে। ম্যানসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বোতলের জলগুলো এখন দূষিত। অনেক টাকার বিনিময়ে ডা: রস সেই বোতলের জল কয়েকজন ব্যক্তিকে খাওয়ালেন। বেশ কিছুদিন কাটলো কিন্তু ‘দূষিত জল’ পান করা ব্যক্তিরা পূর্ববৎ সুস্থ্যই রইলো। কারও মধ্যে অসুস্থ্যতার সামান্য লক্ষণও দেখা গেলো না।
ডা: রস বুঝতে পারলেন না সমস্যাটা কোথায়। তবে এটা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ম্যানসনের বহুল প্রচারিত, প্রশংসিত ও সমর্থিত ‘দূষিত জল’ মতবাদটি মোটেও সঠিক নয়। পরপর এরকম ব্যর্থতার পরও তাঁর গবেষণা কর্মে কোন ভাটা পড়েনি। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের আইপিসে চোখ লাগিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে ব্যবচ্ছেদ কৃত মশার লাশ তিনি পরীক্ষা করেই যাচ্ছিলেন। মশার শরীরের গভীরে চোখ রেখে একদিন ভাবলেন জাত অনুযায়ী রক্ত বিচারের কথা। এবার তিনি আশার আলো দেখলেন। সমসাময়িক সময়েই মসকুইটোম্যানরা কয়েকটি নতুন বৈশিষ্ট্যের মশা ধরে নিয়ে এলেন। এগুলো স্ত্রী জাতীয় এনোফিলিস মশা। পাখার উপর বাদামী রঙের কয়েকটি দাগ দেখে সহজে চেনা যা। তিনি এই এনোফিলিস জাতের মশাগুলোকে এর আগে কখনো পরীক্ষা করেননি। এই নতুন আনা মশাগুলোকে তিনি ম্যালেরিয়া রোগীর ঘরে ছেড়ে দিলেন। এই নতুন জাতের মশার দলটির পেটেই তিনি খুঁজে পেলেন ম্যালেরিয়ার জীবাণু। তার এতোদিনের প্রচেষ্টা সফল হলো। তিনি বিভিন্নভাবে জীবাণুগুলোকে পরীক্ষা করলেন। কয়েকটা পাখিকে কামড়াতে দিলেন। পাখিদেরও ম্যালেরিয়া হলো। রস আবিষাকার করলেন- ম্যালেরিয়া নামক ভয়ংকর রোগটির পালন ও বিস্তার মশাদের মধ্যে এনোফিলিশ জাতের শুধুমাত্র নারীরাই দায়ি। পুরুষরা রক্তলোলুপ বা হিংস্র নয়। তারা ফল, গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তারা মানুষের ঘরে ঢোকার চেয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। কিন্তু নারীরা মোটেও সেরকম নিরীহ নয়। এনোফিলিস নারীরা প্রচন্ড ভয়ংকর। মানুষ বা গবাদিপশুর রক্ত খেতে তারা খুব ভালোবাসে। মানুষের ঘরের বিছানায়, চেয়ারের ফাঁকে এরাই অবৈধভাবে ঘুরে বেড়ায় ও পেটে পেটে জীবাণু ছড়ায়। ডোরাকাটা সুন্দরী নারী এনোফিলিসরা ম্যালেরিয়ার জীবাণূকে পেটের ভিতরে আশ্রয় দেয়; জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে পূর্ণঙ্গতাপ্রাপ্ত হয়। তখন এদের Sporozoite বলে। Sporozoite নারী এনোফিলিসদের ঠোঁট সংলগ্ন লালা গ্রন্থিতে থাকে। অর্থাৎ মশাটি যখন মানুষকে কামড় বসায় তখনই প্যারাসাইটগুলো সেই ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে। আর এভাবেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু একের পর একে ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে থাকে।
ডা: রস তাঁর এই আবিষ্কারের কথা প্রাথমিক দিকে কয়েকজনকে বলেছিলেন। অনেকে তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু তিনি ধৈর্য্য ধরে গবেষণা করে সকলের সামনে তাঁর প্রমাণ উপস্থিত করলেন।
ডা: রসকে তাঁর এই অনবদ্য কীর্তির জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রে ১৯০২ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু একটি মাত্র অনুবীক্ষণ যন্ত্র সম্বল করে মেজর রস মানব জাতির যে উপকার করেছেন তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর আবিষ্কারের আগে প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে ম্যালেরিয়া একটি ভয়ংকর রোগের নাম ছিলো। ডা: মেজর রস ম্যালেরিয়া উৎপত্তির যথার্থ স্থান চিহ্নিত করেমানুষের অসহায় মৃত্যুর সম্ভাবনাকে একেবারে সীমিত করে এনেছেন। পরে তার নামে Institute of Tropical Medicine এর নামকরন করা হয়। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই মহান চিকিৎসকের মৃত্যু হয়।
Read More ...