Showing posts with label সচেতনতা. Show all posts
Showing posts with label সচেতনতা. Show all posts

Monday, January 12, 2009

২০০৮ সালের সেরা ১০টি বৈজ্ঞানিক ঘটনা -০২

নতুন জগৎ:
বিজ্ঞানীরা সবসময় এমন ধারণা করতেন যে সূর্য ছাড়াও এমন নক্ষত্র আছে যার চারপাশে পৃথিবীর মতো গ্রহ নিয়মিত আবর্তিত হয়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের আগে এরকম বহির্জাগতিক গ্রহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই বৎসরে এরকম কিছু সৌরজগতের দেখা মেলে। ২০০৮ সালের জুন মাসে মাইকেল মেয়র (Michel Mayor) ৪৫টি সৌরজগত খুঁজে পান, এর কয়েকটি পৃথিবীর চাইতে মাত্র ৪.২গুণ বড়। কিন্তু সেগুলোতে প্রাণ বিকাশের উপযোগী কোন পরিবেশ রয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখার মতো শক্তিশালী যন্ত্র মেয়রের ছিলনা। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মহাকাশবিজ্ঞানীদের দুটো দল চারটি বহির্জাগতিক পৃথিবীর দেখা পান। এই প্রথম এ জাতীয় ভিনগ্রহের স্পষ্ট ও আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে তোলা ছবি পাওয়া গেল।

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া:
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী বার্কলে (Berkeley) এবং কালিফ (Calif) ঘোষণা করেন যে, তারা এমন পোষাক আবিষ্কার করতে পেরেছেন যা পরিধান করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্ভব । বিষয়টা আসলে পদার্থ ও আলোকবিজ্ঞানের এক জটিল সংমিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তারের একটি জালিকা এলুমিনিয়ামের টিউবের ভিতরে স্থাপন করে একটি পাতলা কাপড়ের মতো বস্তু উদ্ভাবন করেছেন। এটা কাগজের চাইতে ১০ গুণ বেশি পাতলা। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তারা এই পদার্থ দিয়ে এমন একটি বহিরাবরণ তৈরি করতে পারবেন, যার মধ্যদিয়ে আলোর স্রোত প্রবাহিত করলে তা কার্যকরীভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই বিষয়টা এখনও পরীক্ষাধীন। খরচও অনেক বেশি। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতে আমরা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি, এই আবিষ্কারের ফলে একথা বলা আর কঠিন নয়।

সিনোজয়িক পার্ক (Cenozoic Park):
একগুচ্ছ চুল সাধারণত কোন খবরের হেডলাইন হয়না। কিন্তু ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে এমনই একটা ঘটনা ঘটে গেল। জীবরসায়নের অধ্যাপক স্টিভেন স্কাসটার (Stevan Schuster) ঘোষণা করলেন যে তিনি লোমশ ম্যামথের চুল থেকে তার জিনোমের ৮০ ভাগ পুনর্গঠন করতে পেরেছেন। এটা শুধুমাত্র তিন বিলিয়ন ডিএনএ'র ধারাবাহিকতাকে একত্রিত করা নয়, এই ঘটনাটি ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবের অন্তর্গত উপাদানকে বুঝতে সহায়তা করবে। তবে এখনি জুরাসিক পার্কের মতো লোমশ ম্যামথের কোন দল তৈরি করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই আবিষ্কার যে সেই সম্ভাবনাকে উস্কে দেয়নি, তা বলা কঠিন।

বিজ্ঞান পড়ুয়ার পরিসংখ্যান:
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের পরিমাণ ১৯৭৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৭% হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য জানতে সম্প্রতি মিসিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জনৈক অধ্যাপক এক জরীপ চালান। এতে দেখা যায় বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কিঞ্চিত বেড়েছে। মাত্র ২৫%। যে জাতি উড়োজাহাজ, বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছে, যারা চাঁদে পা রেখেছে তাদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের এই পরিমাণ মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

প্রথম পরিবার:
মধ্য জার্মানিতে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো পরিবারের ফসিল পাওয়া গেছে। ৪৬০০ বৎসরের পুরনো এই পরিবারটি কোন আক্রমণের শিকার হয়ে মারা গেছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পাথর যুগের এই পরিবারটির প্রত্যেক সদস্যের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে মেরুদণ্ড ক্ষতবিক্ষত ছিল। পরিবারের দুইটি পুরুষ শিশুর একটি ৮-৯ বৎসর বয়স ও অন্যটি ৪-৫ বৎসর বয়সের ছিল। হয়তো এই পরিবারটিই সবচাইতে পুরনো পরিবার নয়। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফসিলের মধ্যে এটিই যে পুরনো পরিবারের এতে কোন সন্দেহ নাই।

সূত্র: টাইম
Read More ...

Friday, November 21, 2008

বিশ্ব টয়লেট দিবস

Water Partners থেকে একটা মেইল গত ২০ তারিখে পেয়েছিলাম। (পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময় পাই নি)। তারা ১৯ নভেম্বর তারিখে বিশ্ব টয়লেট দিবস পালন করেছে। তাদের মনে সংশয় ছিল যে হয়তো অনেকে তাদের এই চিন্তাকে রসিকতা হিসেবে মনে করতে পারে। সে জন্য মেইলের প্রথমে উল্লেখ ছিল: "It is no joke. Today we celebrate World Toilet Day and the incredible value of the can. Call it what you will – the pot, the loo, the throne, the latrine, the water closet, the bog – it’s one of the most important inventions in history."

তাদের যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য। কেন এরকম একটা দিনের প্রয়োজন দেখা দিল সে সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়ে তারা বলেছে:
বিশ্বের বেশিরভাগ রোগের সংক্রমণ ঘটে মানবশরীরের বর্জ্য পদার্থ থেকে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ ভাগ অর্থাৎ ২.৫ বিলিয়ন মানুষ এখনও স্যানিটারি সুবিধার আওতায় আসেনি। ১.২ বিলিয়ন মানুষের কোন টয়লেট নেই। মাটিতে মলত্যাগ করার জন্য কোন গর্ত নেই, কোন পিট ল্যাট্রিনও তাদের নেই। প্রত্যেক বৎসর ১.৮ মিলিয়ন শিশু ডায়রিয়াতে মারা যায়, প্রতিদিন মারা যায় ৪.৯০০ শিশু।

এই অবস্থায় আমরা যারা সচেতন বলে নিজেদেরকে মনে করি, তাদের করার আছে অনেক কিছু।
  • বিস্তারিত তথ্য পড়ুন ওয়াটার পার্টনারস এর ওয়েবসাইটে
  • পৃথিবীর বিভিন্ন রকমের ল্যাট্রিনের ছবি রয়েছে এখানে
Read More ...

Sunday, July 20, 2008

সর্বোত্তম ওষুধ হাত ধোয়া

এবারের "গণস্বাস্থ্য" (২৭ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, আষাঢ় ১৪১৫) পত্রিকায় একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখে পড়ল। "রোগ তাড়াতে হাত ধোয়া কেন সর্বোত্তম ওষুধ হতে পারে" শিরোনামের লেখাটি আমার কাছে প্রাত্যাহিক সচেতনতার অন্যতম অংশ বলে মনে হল। পারিবারিক এই সাধারন সচেতনতাটি সকলেই জানেন; আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য শেয়ার করছি।

রোগ তাড়াতে হাত ধোয়া কেন সর্বোত্তম ওষুধ হতে পারে

আমরা প্রত্যেকেই জানি যে, হাত ধোয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক কালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বারে বারে এবং সঠিক সময়ে ও নিয়মে হাত ধুলে আপনার পরিবার অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থেকে বহুলাংশে রেহাই পাবে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হাত ধোয়া বিষয়ক গবেষণায় চিকিৎসা এবং খাদ্য সেবা বিভাগের ব্যক্তিদেরকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে গত ডিসেম্বর, ২০০৭ মাসে 'আমেরিকান জার্নাল অব ইনফেকশন কন্ট্রোল' নামক সাময়িকীতে বলা হয়েছে যে, ঘরো পর্যায়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে সংক্রামক রোগব্যাধির বিস্তার রোধ করা সম্ভব। কতিপয় গবেষণায় দেখা গেছে, হাত হচ্ছে সকল ধরনের সংক্রমণ বিস্তারের একক বড় মাধ্যম।
টয়লেট ব্যবহারের পর কিংবা বাচ্চাদের ন্যাপি বদলানোর পর হাত ধুতে জানে প্রায় সকলেই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, বাথরুম ব্যবহারের পর বাচ্চাদের যত্নআত্তি করার সময় অনেকের হাতেই ময়লা লেগে থাকে।
অতি সম্প্রতি পোলিও'র ভ্যাকসিন নেয়া শিশুদের নিয়েও গবেষণা হয়েছে। দেখা গেছে, ভ্যাকসিন নেয়ার পর ভাইরাস শিশুর মলে স্থান নেয়। গবেষকরা শতকরা ১৩ ভাগ বাথরুম, শোবার ঘর, রান্নাঘরের উপরিভাগে ভাইরাসের সন্ধান পেয়েছেন। মলবাহিত ভাইরাস বিভিন্ন স্থঅনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যে সকল বাড়িতে খাদ্যবাহিত ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, সে বাড়ির টয়লেটেও ব্যাকটেরিয়ার আনাগোনা দেখা গেছে। টয়লেটে ব্যবহৃত পানিও দূষণের একটি উৎস।

দরজার হাতল, বাথরুমের ট্যাপ এবং টয়লেটের হাতল বাড়িতে জীবাণু দূষণের প্রধান উৎস। এসব সর্বদাই পরিষ্কার রাখতে হবে এবং এগুলো স্পর্শ করার পর হাত ধুতে হবে। এক জরিপে দেখা যায়, একজন স্বেচ্ছাসেবী ভাইরাস দূষিত দরজার হাতল স্পর্শ করার পর অন্যান্য কয়েকজনের সঙ্গে করমর্দন করেন। দেখা যায়, এর ফলে ছয়জনের দেহে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।
গবেষকরা যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন তা এই যে, হাত ধোয়ার সময়টা অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার। টয়লেট ব্যবহারের পর, হাঁচি দেয়ার পর এবং খাদ্য নড়াচড়ার পর হাত ধোয়া দরকার। ডায়াপার ব্যবহার, পোষা প্রাণী পরিষ্কার করার পর, আবর্জনার পাত্র ধরার পর, কাপড় ধোয়া, থালাবাসন মাজার ন্যাকড়া নাড়াচাড়ার পর হাত ধুতে হবে।

হাত ধোয়ার মত সাদামাটা বিষয়টা পারিবারিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলবে - এটা বিশ্বাস করা কঠিন মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে ২০০৩ সালে হংকং এ সার্স (SARS) ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এটা ছিল মারাত্মক ধাঁচের ভাইরাস ঘটিত নিউমোনিয়া। এ ঘটনার পর মৌলিক স্বাস্থ্য সচেতনতা সহ নিয়মিত হাত ধোয়ার বিষয়টা গুরুত্ব লাভ করে। এর ফলে সার্স - প্রচণ্ডতা থেমে যায় শুধু তা-ই নয়, ফ্লু সহ অন্যান্য ফুসফুসের সমস্যাও কমে যায়।
Read More ...

Tuesday, June 3, 2008

বর্ণান্ধতার পরীক্ষা

যাদের চোখে রং দেখার বা চেনার কোন সমস্যা নেই তারা নিচের ছবির সংখ্যাগুলি অনায়াসে স্পষ্ট দেখতে পাবে। কিন্তু কেউ যদি সংখ্যাগুলো দেখতে না পারে তাহলে তাকে বর্ণান্ধ না বলে উপায় থাকবে না। সাধারণ জীবন যাপনে এর কোন খারাপ প্রভাব নেই। তবে কিছু কিছু কাজ বা চাকুরি আছে যেগুলোতে এই ধরণের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে অযোগ্য বলে মনে করা হয়।
সাধারণত এশিয়ার ৪%-৬% মানুষ, ইউরোপে ৬%-৮% মানুষ এবং আফ্রিকার ২%-৪% মানুষের চোখে বর্ণচেনার সমস্যা রয়েছে।
এই পরীক্ষাটি নিজে নিজেই করা যায়। নীচের ছবিটি মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করুন। প্রয়োজনবোধে ছবিটির উপর ক্লিক করে তাকে একটু বড় করে নিন। এবার দেখুনতো পাশে লেখা সংখ্যাটি বর্ণিল বিন্দুর গোলকের মধ্যে দেখতে পান কি না?

Read More ...

Tuesday, May 6, 2008

আজ বিশ্ব এ্যাজমা দিবস


আজ বিশ্ব এ্যাজমা দিবস। এ্যাজমা সম্পর্কে সারাবিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই দিনটির প্রস্তাবনা। বিভিন্ন প্রভাবকের কারণে শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে লালার(Mucus) পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে শ্বাসনালীর ভিতরের আয়তন সংকুচিত হয়ে যায়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। রোগী হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিতে থাকে। একেই এ্যাজমা বলে। বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলে যেরকম পরিবর্তন হচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন আগামী দিনে সারা পৃথিবীতেই এ্যাজমা রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণ এর অন্যতম কারণ।

বিশ্বের এ্যাজমা রোগীদের মধ্যে প্রত্যেক ২৫০ জনে মারা যায় ১ জন। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ এ্যাজমারোগে আক্রান্ত। এবারের এ্যাজমা দিবসের শ্লোগান হল 'আপনার এ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আপনিই'। আসলেই তাই। নিজেই যদি একটু সচেতন থাকা যায় তাহলে এ্যাজমার আক্রমণ থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়।

১৯৯৮ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় প্রথম এ্যাজমা রোগ বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সঙ্গে ওই বছরই ৩৫টিরও বেশি দেশে প্রথম বিশ্ব এ্যাজমা দিবস উদযাপিতহয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর এ্যাজমা (GINA) এর যৌথ উদ্যোগে দিনটি পালিত হয়। (GINA) হল ন্যাশনাল হার্ট, লাঙ এবং ব্লাড ইনস্টিটিউটের সমন্বিত সহযোগিতায় গঠিত একটি প্রকল্প।
Read More ...

Thursday, May 1, 2008

মেক্সিকোর আকসুলাহটুহল

মেক্সিকো শহরের পাশে একটি লেকের নাম সোচিলিকোহ (Xochimilco)। এই লেকের তলদেশে এক অদ্ভুত ধরণের প্রাণী পাওয়া যায়। AXOLOTL নামের এই প্রাণীটি দেখতে কিছুটা উদ্ভট। এই নামের উচ্চারণ ACK-Suh-LAH-tuhl, এটা এক ধরণের দুর্লভ উভচর প্রাণী। গিরিগিটি সদৃশ এই প্রাণিটি লম্বায় সাধারণত ৬-৮ ইঞ্চি। কিন্তু ১ ফুটেরও বেশি দৈর্ঘ্যের প্রাণী দেখা গেছে। গায়ের রঙ সাধারণত কালো বা গাঢ় বাদামী। কিন্তু সাদা বা এলবিনো হওয়াটা এদের জন্য বিরল নয়।এই আকসুহলাটুহল এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তার অদ্ভুত পাখনা। মোটা মাথার ঠিক পিছন থেকে বের হওয়া অতিরিক্ত পাখনাগুলো প্রায় তার নিজ শরীরের সমান বড়।

এরা প্রধানত: সোচিলিকোহ লেকেই বাস করে। অন্যান্য লেকে কদাচিৎ তাদেরকে চোখে পড়ে। জলের গভীরে এদের বাস করা পছন্দ, কিন্তু জলের কিনারেও এরা মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসে। জীবনকাল এদের কম নয়। প্রায় ১৫ বৎসর বাছে এক একজন। খাদ্য হিসেবে এদের প্রধান পছন্দ বিভিন্ন রকমের শামুক, কেঁচো, বিভিন্ন পোকার লার্ভা, মাছের পোনা ইত্যাদি। এরা নিজেরা যেমন শিকার করে বেঁচে থাকে তেমনি এরা নিজেরাও বিভিন্ন মাংশাসী প্রাণীর শিকার হয়ে যায়। বড় মাছ, বক এদের অন্যতম শত্রু। তবে মানু্ষও এদের সাথে শত্রুতা করতে কম যায় না।

আকসুলাহটুহল এর সংখ্যা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ মানুষ। ভিন্নরকম শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে একুরিয়াম মাছ হিসেবে এদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। খাদ্য হিসেবেও ভোজনরসিকদের কাছে এরা দারুণ সমাদৃত। এছাড়া লেকের জলের দূষণ এদের জীবনকাল কমিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে নাম বিপন্ন প্রাণিদের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

আরও তথ্য পাওয়া যাবে এখানে। ছবি কৃতজ্ঞতা: animals.nationalgeographic.com
Read More ...

Wednesday, April 30, 2008

General Information about Bird flu

A pandemic is a global disease outbreak. A flu pandemic occurs when a new influenza virus emerges for which people have little or no immunity, and for which there is no vaccine. The disease spreads easily person-to-person, causes serious illness, and can sweep across the country and around the world in very short time.

It is difficult to predict when the next influenza pandemic will occur or how severe it will be. Wherever and whenever a pandemic starts, everyone around the world is at risk. Countries might, through measures such as border closures and travel restrictions, delay arrival of the virus, but cannot stop it.

Health professionals are concerned that the continued spread of a highly pathogenic avian H5N1 virus across eastern Asia and other countries represents a significant threat to human health. The H5N1 virus has raised concerns about a potential human pandemic because:

  • It is especially virulent
  • It is being spread by migratory birds
  • It can be transmitted from birds to mammals and in some limited circumstances to humans, and
  • Like other influenza viruses, it continues to evolve.

Since 2003, a growing number of human H5N1 cases have been reported in Asia, Europe, and Africa. More than half of the people infected with the H5N1 virus have died. Most of these cases are all believed to have been caused by exposure to infected poultry. There has been no sustained human-to-human transmission of the disease, but the concern is that H5N1 will evolve into a virus capable of human-to-human transmission.

Read More ...

Friday, April 25, 2008

ম্যালেরিয়া দিবস

আজ ম্যালেরিয়া দিবস। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে হু এর ৬০ তম অধিবেশনে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস দিবস এর ধারণাটিকে গ্রহণ করা হয়।

ম্যালেরিয়া এখনও প্রান্তিক মানুষের কাছে মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসে। প্রত্যেক বৎসর ৩৫০ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং তার মধ্যে ১ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে মারা যায়। আফ্রিকাতে এই রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। সেখানে প্রত্যেক ৩০ সেকেন্ডে একজন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ম্যালেরিয়া রোগকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া এখনও সদর্পে তার রাজত্ব বিস্তার করেই চলেছে। বিশেষত সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন দেশগুলো ম্যালেরিয়ার অবাধ রাজত্বের জন্য উপযোগী। ৫ বৎসর বয়সের কম শিশু ম্যালেরিয়ার আক্রমণের প্রধান শিকার। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েরা মারাত্মক রকমের রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকে।

রুয়ান্ডা, ঘানা, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, সেনেগাল, নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা, মালি প্রভৃতি দেশের সরকার ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউনিসেপ ও হু এর সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

রুয়ান্ডা, ঘানা, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, সেনেগাল, নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা, মালি প্রভৃতি দেশের সরকার ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউনিসেপ ও হু এর সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধে ঘানা একটি দারুণ কার্যকরী উপায় বের করেছে। তারা বসতবাড়ির চারপাশে নিম গাছ লাগিয়েছে। এছাড়াও নিমের পাতা চায়ের মত গরম জলে ফুটিয়ে সপ্তাহে একবার পান করলে লিভারকে সুস্থ রাখা যায়।

পাশের ছবির কমলা রঙের দেশগুলিতে ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
ছবি: www.rollbackmalaria.org
Read More ...

Monday, March 31, 2008

শিশুরা আরও বলতে চায়

শিশুরা আরও বলতে চায়

সুশান্ত বর্মন

পূর্ণবয়স্ক নারী পুরুষমাত্রই স্বপ্ন দেখে একটি শিশুর। প্রধানত এজন্যই মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। বহুদিনের স্বপ্ন যখন বাস্তবে পরিণত হয় তখন পিতামাতার আনন্দের সীমা থাকে না। আনন্দের প্লাবনে তাদের পৃথিবী উপচে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে পুষ্পকলির মত শিশু বেড়ে ওঠে। ১ দিন ২ দিন করে পার হয় আর শিশুর শরীর বাড়তে শুরু করে। তারপর অর্থহীন কিছু শব্দ দিয়ে প্রকাশ করে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এই পর্যায়ে কিছু অতিরিক্ত মনোযোগের খুব দরকার।

লক্ষ্য করা যায় যে শিশু কথা বলা যখন শিখে যায় তখন যে প্রচুর কথা বলে। চারপাশের অচেনা জগতকে চিনে নেবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় সে প্রশ্ন করা শুরু করে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অজস্র প্রশ্ন এসে তার মগজে জমা হয়। ঘনিষ্ঠজনকে প্রশ্ন করে জেনে তৃপ্ত করতে চায় তার নতুন কৌতুহল। কিন্তু বড়রা বেশিরভাগ সময় এটা মেনে নিতে পারে না। শিশুর কৌতুহলপ্রবণতাকে ধমকের আঘাতে সঙ্কুচিত করতে চায়। শিশু বাধ্য হয় চুপ করতে। অজানাকে জানার স্পৃহা তার ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পরে। বিপরীতে কিছু কিছু জন্ম হয় বাকশক্তিহীন হয়ে। জন্ম থেকে তাদের শারীরবৃত্তিয় একাধিক কারণে তারা কথা বলতে পারেনা। এর মধ্যে প্রধান কারণ হল কানের সমস্যা। দেখা গেছে কানের কোন জন্মগত ত্রুটির কারণে কথা বলতে না পারা শিশুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কানের ত্রুটির কারণে তারা পরিপার্শ্বের কোন শব্দ শুনতে পারেনা। তাদের পৃথিবী হয়ে পরে শব্দহীন, নীরব নিথর। শব্দকে চিনতে না পারার কারণে তারা কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না বা চায় না।

শিশুর কথা বলার ইচ্ছা বা নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের কাছে বাচালতা হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে তার অর্থ ভিন্নরকম। কারণ শিশু কিভাবে কথা বলা শেখে বা ভাষা আয়ত্ব করে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্যের পরিমাণ খুব কম। শব্দময় এই জগতে একটি শিশু ঠিক কিভাবে নতুন শোনা শব্দকে হৃদয়ঙ্গম করে কিংবা নিজের মগজে কিভাবে একটি শব্দকে অনুধাবন করে এ বিষয়টা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও দুর্বোধ্য।

বধির শিশুদেরকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা শিশুদের ভাষার উপর দখল লাভের প্রচেষ্টাকে গভীর মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। যে সমস্ত শিশু কানের সমস্যার কারণে বধির হয়ে যায়, তাদের কেউ কেউ ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করলে সুস্থ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট কম্ব রিলে হাসপাতালের বিজ্ঞানীরা শ্রবণসক্ষমতার মাধ্যমে শিশুর ভাষাদক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাদের প্রধান অনুসন্ধানের বিষয় হল - শুনে শুনে কিভাবে একটি শিশু ভাষার উপর দখল প্রতিষ্ঠা করে? এর সাথে সাথে আরো কিছু প্রশ্ন বিজ্ঞানীদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভাষা আয়ত্ব করার পদ্ধতি তাদের কিরূপ? চারপাশের বিচিত্র ধ্বনিগুলো কিভাবে তাদের বোধগম্য হয়? একজন সুস্থ শিশুর মত ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা শিশু কি একই রকমভাবে বিভিন্ন শব্দের পার্থক্য বুঝতে পারে? শিশুরা যা দেখে তার সাথে শোনা শব্দকে কিভাবে তারা মিলিয়ে নেয় বা আলাদা করে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা হলে গবেষকরা শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের অগ্রগতিকে আরো ভালভাবে বুঝতে পারবেন। যাদের কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে কিংবা যাদের স্পিচ থেরাপি দেয়া হচ্ছে তাদের চিকিৎসার অগ্রগতি পরিমাপ করা আরও সহজ হবে।

সদ্যজন্ম হওয়া একটি শিশুর কাছে এই জগৎটা বিস্ময়কর। দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তুই সে চিনে নিতে চায়। এজন্য সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বস্তুটিকে চিনে চিনে চায়। শিশুর এই সহজাত আচরণটি বিজ্ঞানীদের প্রধান কৌতুহলের বিষয়। বিজ্ঞানীরা বলেন - শিশুর চোখের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করলে তার ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি বোঝা সহজ হবে। এই একটি বিষয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে আমরা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারব।

বিভিন্নরকম উদ্দীপক যেমন: শব্দ বা আলো ইত্যাদি শিশুকে সহজে আকৃষ্ট করে। এ ধরণের উদ্দপনাতে শিশু তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়। তারা বিভিন্নরকম শব্দকে কিভাবে আলাদা করে এবং এই সাফল্য তাদের ভাষা শিক্ষায় কিরকম প্রভাব ফেলে তা বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করতে পেরেছেন। কোন একটি নির্দিষ্ট বস্তুর দিকেএকটি শিশু কখন বা কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল তার উপর এই পরিমাপ পদ্ধতি নির্ভর করে। একটি সহজ পরীক্ষা দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পিতা অথবা মাতার সাথে শিশুকে একটি অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছে। তাদের সামনে রয়েছে বড় পর্দার টিভি। টিভির উপরে লুকানো আছে একটি ক্যামেরা। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে ৫ থেকে ১৩ মাস বয়সী শিশুরা তাদের সামনে থাকা মহিলার মুখের দুইরকম প্রতিচ্ছবি দেখে। দুইরকম প্রতিচ্ছবিতর উচ্চারিত শব্দ দুইরকম হবে না কি একটিমাত্র শব্দ হিসেবে শিশু গ্রহণ করবে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এতদিন সংশয়ে ছিলেন। যদি সঠিকভাবে ঠোঁট নাড়ানোর উপর শিশুর ভাষা শিক্ষার বিষয়টি নির্ভর করে তারপরও বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে এই সমস্যার উত্তর রয়েছে শিশুর চোখে।

আর একটি পরীক্ষায় দীর্ঘক্ষণ ধরে শিশুকে লাল ও সাদা ডোরাকাটা প্যাটার্ন দেখানো হয়েছে। এর পাশাপাশি একবার বিভিন্নরকম শক্দ শোনানো হয়েছে আবার কখনও কোন শব্দ শোনানো হয়নি। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে সুস্থ শ্রবণশক্তির শিশুরা মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দের প্রতি বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্নরকম শব্দের মধ্যে মানবীয় শব্দকে আলাদা করতে পারে। কিন্তু কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপিত শিশুদের ক্ষেত্রে ফলাফল কিছুটা ভিন্নরকম। তারাও বিভিন্ন শব্দের পার্থক্য ধরতে পারে তবে তার জন্য কিছুটা সময় ব্যায় করতে হয়। ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করার সাথে সাথে তারা শব্দ চিনতে পারেনা। এর জন্য এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে জন্ম থেকে কানে শোনেনা এমন শিশুদের সাথে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের মৌলিক পার্তক্য কোথায় তার কার্যকারণ অনুসন্ধান বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও জটিল বিষয়। তারা বিভিন্ন রকম ছবি, শব্দ ও উদ্দীপক ব্যবহার করে সমস্যাটির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই গবেষণাকর্মের প্রধান ড. ডেরেক এম হাউস্টোন বলেন - সাধারণ শিশুরা হঠাৎ করে হওয়া শব্দের উৎসের দিকে সরাসরি তাকায়। কিন্তু যারা বধির হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেছে কিংবা যাদের কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে তাদের আচরণ এক্ষেত্রে ভিন্নরকম। একই রকম হঠাৎ করে হওয়া শব্দ তাদের মনে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। শিশুদের ভাষা শিক্ষার কৌশল বোঝার সাথে সাথে এই সমস্যাটিও আমরা বুঝতে চাই।

শিশুর ভাষা শিক্ষা গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা অন্য আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ অভিনিবেশ সহকারে কাজ করে যাচ্ছেন। শিশুদের ভাষা আয়ত্ব পদ্ধতিকে অনুধাবনের বিষয়ে পিতামাতাদের কতটা আগ্রহ বা মনোযোগ আছে এটা বিজ্ঞানীরা জানতে চান। ড. হাউস্টোনের সহকারী গবেষক ড. বেরগেসন বলেন - আমাদের এ বিষয়ে আরেকটি প্রজেক্ট আছে। আমরা জানতে চাই মায়েরা ঠিক কেন স্বত:প্রণোদিত হয়ে শিশুদের সাথে কথা বলে। মজার ব্যাপার হল যে সব শিশুদের ককলিয়ার ইমপ্লান্ট করা হয়েছে তাদের শ্রবণ বয়সের (Hearing age) দিকে মায়েরা খেয়াল রাখে। কতদিন আগে শিশুর কানে অস্ত্রপোচার করা হয়েছিল তার উপর শ্রবণ বয়স নির্ভর করে। বিজ্ঞানীদের আবিস্কৃত পন্থায় ১২ মাস আগে কানের ককলিয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল এমন ২০ মাস বয়সী শিশুর শ্রবণ বয়স হল ১ বৎসর। এ ধরণের শিশুর সাথে তাদের মা যখন গল্প করে তখন শ্রবণবয়সটার কথা তাকে মনে রাখতেই হয়। না হলে শিশুর সাথে যোগাযোগ ঠিকভাবে স্থাপন করা যায় না। এটা মায়েরা তাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে অনুভব করে। গবেষণাকার্য চলাকালে অবুঝ শিশুরা/ দুগ্ধপোষ্য শিশুর (Infants and toddlers) কি বলতে চায় তা ড. হাউস্টোন ও বেরগেনসন গভীর মনোযোগের সাথে শুনেছেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছেন শিশুরা কিছু একটা বলতে চায়। যে শব্দটি তারা শিখেছে তা তারা বলতে চায়। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শেষে গবেষকরা একটি সিদ্ধান্তে এসেছেন। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন - শিশুর উচ্চারিত শব্দগুলি সাধারণ শিশুতোষ শব্দের চাইতেও অনেক বেশি। আমাদের দৃষ্টিতে তার কোন অর্থ নাও থাকতে পারে কিন্তু শিশুর কাছে তা তার মর্মোচ্চারণ। সে বড়দের মত নিজেও কিছু বলতে চায় এবং নিজের ভাষায় তা সে বলে। যা আমরা মূল্যায়ন করি না।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন বড়রা যদি শুধুমাত্র একটুখানি ধৈর্য ধরে শুনতো তাহলে শিশুরা অনেককিছুই বলতো। তারা বলতে চায়। শ্রুত শব্দকে তাদের নিজের মত করে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে চায়। বড়রা যদি শিশুদের কথার প্রতি ভালো শ্রোতা হত তাহলে তাদের ভাষাশিক্ষার গতি অনেক বেড়ে যেত। ভাষাকে আয়ত্ব করার সামর্থ বেড়ে যেত কয়েকগুণ।
Read More ...

Saturday, March 22, 2008

আজ বিশ্ব জল দিবস

আজ বিশ্ব জল দিবস। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রত্যেক ৬ জনের মধ্যে মাত্র একজন নিরাপদ জলের সুবিধা পায়। নারী ও শিশুরা ২০০ মিলিয়ন ঘন্টা প্রতিদিন জলের খোঁজে ব্যয় করে। জল বিষয়ে কিছু তথ্য নিচে প্রদান করা হল:-
  • প্রত্যেক ১৫ সেকেন্ডে একজন শিশু জলবাহিত রোগে মারা যায়।
  • ১ বিলিয়নের বেশি মানুষ বিশুদ্ধ জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
  • ৮৮% রোগ দূষিত জল থেকে হয়।
  • বিশ্বের সব হাসপাতালের মোট বিছানার অর্ধেকে জলবাহিত রোগী আছে।
  • উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সুপেয় জল সরবরাহ করার জন্য নেয়া প্রকল্পসমূহের ৫০% ব্যর্থ হয়ে গেছে।
  • আগামী ২ দশকে প্রত্যেক মানুষের জন্য সরবরাহ করা জলের পরিমাণ ৩ ভাগের মত কমে যাবে।
বাংলাদেশে আর্সেনিক সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে দূষিত জরের কারণে। শহরাঞ্চলে বিশুদ্ধ জলের সমস্যা প্রকট।
Read More ...

Saturday, March 8, 2008

তিনি আরজ আলি মাতুব্বর

তিনি আরজ আলি মাতুব্বর

সুশান্ত বর্মন

প্রায় ৫০-৬০ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাই প্রথম প্রশ্ন তোলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে? মানুষ কোত্থেকে আসে? বেঁচে থাকে কেন? মারা যায় কেন? শুধু মানুষ নয়। প্রকৃতিকে নিয়েও তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছিল। নদী প্রবহমান কেন? বাতাস কি? পাহাড় এলো কোত্থেকে? সূর্য আলোকিত কেন? সহস্র বছর আগের অবিকশিত ও আদিম বুদ্ধি দিয়ে আদিম মানুষেরা ভেবে নিয়েছিল তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান। প্রাণীজগতের সব প্রাণীই নিজেদের যেকোন সমস্যায় নিজ নিজ বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই আধুনিক যুগেও প্রাণীদের চোখে মটরগাড়ীগুলো শব্দকারক ও দূর্গন্ধযুক্ত একটি বিদঘুটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নয়। একটি যন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণের জন্য আমরা প্রাণীদেরকে দোষ দিতে পারি না। কারণ যন্ত্রকে যন্ত্র মনে করার জন্য যে জ্ঞান, মেধা, মণীষা, অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা তাদের নেই। জীব জগতের কোটি বছরের ইতিহাসে মনুষ্যেতর প্রাণীগুলো কখনো যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেনি, বা করতে চায়নি। বানর, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য কয়েকটি মাত্র প্রাণী অবশ্য যন্ত্রের ব্যবহার করে। উঁচু ডাল থেকে ফল পাড়তে লাঠি, শত্রু তাড়াতে ঢিল, খাদ্য ভাঙতে পাথর ইত্যাদির ব্যবহার তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের যন্ত্র সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা অতটুকু প্রাথমিক অবস্থাতেই থেকে গেছে। আর কোন অগ্রগতি হয়নি এবং তা সহজাত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ যন্ত্রের ঐ সীমিত ব্যবহারটুকুর বেশি তাদের প্রয়োজন হয়নি। তাই যন্ত্রের আবিষ্কার বা উৎকর্ষের জন্যও কোন রকম অভ্যন্তরস্থ আগ্রহ তারা বোধ করেনি। কিন্তু মানুষ মানবেতর নয়। ক্রমাগত নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আগ্রহ মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে মানুষ নিরন্তর তার পূর্বতন অনভিজ্ঞতা, অনগ্রসরতা, পশ্চাৎপদতা, সীমিত যান্ত্রিক শক্তি প্রভৃতিকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাগ্রহে বরণ করেছে ভবিষ্যতের নতুনত্ব, জ্ঞান, আবিষ্কার, মনন। তাই অন্যান্য পশুদের জীবন যাত্রা এখনও আদিম যুগের ন্যায় থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা পাল্টে গেছে। মানুষ এগিয়ে এসেছে বর্তমানের কুসংস্কারহীন প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে।

উপর্যুক্ত আলোচনাটি তত্ত্ব হিসাবে অসাধারণ এবং বাস্তব মনে হলেও এতে একটি ত্রুটি আছে। কারণ মানুষ বিভক্ত বহু ভাগে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতির কাঠামো ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যভেদে মানুষ বিভিন্ন রকম। কেউ পাহাড়বাসী, কেউ সমতলবাসী, কেউ দ্বীপবাসী, কেউবা বনবাসী। কেউ রুক্ষ অঞ্চলে, কেউবা উর্বর ভূমিতে বাস করে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয় মানুষের সার্বিক অগ্রগতির আয়তন। মাটির গঠন, বাতাসের আর্দ্রতা, সূর্যালোকের প্রখরতা, গাছপালার পরিমাণ মানুষের আত্মিক বিকাশ ও নৈতিক মানদণ্ড গঠনে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যে ব্যক্তি বাস করে রুক্ষ্ম ভূমিতে তার তুলনায় বাংলাদেশের ন্যায় উর্বর জলাভূমিতে বসবাসকারী ব্যক্তির মন অনেকাংশে নরম হবেই। অর্থাৎ মানুষের মানসিক পরিবর্তন সারা পৃথিবীতে সমান্তরাল গতিতে অগ্রসর হয়নি। যে ব্যক্তি মরুভূমিতে বাস করে সে পৃথিবী সম্পর্কে যেরকম ধারণা পোষণ করে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা লালন করে উর্বর ভূমিতে বাসকারী মানুষ। যে জনগোষ্ঠী পাহাড়ে বাস করে তাদের ধারণার সাথে দ্বীপবাসীর ধারণার কোন অংশেই মিল নেই। প্রত্যেকে পৃথিবী, প্রাণীজগত এবং মনুষ্যত্বকে বিচার করে ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক অবস্থান থেকে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে জগৎকে বিচার করার ফলেই মানুষে মানুষে এত পার্থক্য। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীও মানুষ বিভিন্ন রকম। এক কালে ধারণা করা হতো মানুষের বুদ্ধিতাত্ত্বিক অগ্রগতি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে সে ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছে।

আমরা বাঙালিরা পৃথিবীর যে অঞ্চলে বাস করি সে অঞ্চলের মাটি খুবই উর্বর। উত্তরের হিমালয়ের পাদদেশ ধুয়ে পলি নিয়ে এসে এই অঞ্চলের নদীগুলো বঙ্গভূমির শরীর তৈরী করেছে। ফলে এখানকার মানুষের খাদ্যের অভাব কখনও হয়নি। প্রকৃতির ভালোবাসায় সিক্ত মানুষেরা ব্যক্তিগত জীবনেও ভালোবাসাপ্রবণ হবার কথা। কিন্তু বর্তমানকালের সামাজিকতা তুলে ধরে বাঙালির আবহমানকালের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তাই বলে বাঙালির বর্তমানের হীন চরিত্রের চিত্র চিরকালের নয়। আজ থেকে হাজার বছর আগেও বাঙালি চরিত্রের সাথে প্রকৃতির চরিত্রের তত অমিল ছিল না। ক্রমাগত পাহাড়বাসী ও মরুভূমিবাসীদের নৈতিক আগ্রাসনের জালে বাঙালি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছে গত হাজার বছরে। নিজ প্রকৃতি সম্ভূত নীতিবোধ একাধিক কারণে বিসর্জন দিয়ে তারা গ্রহণ করেছে পাহাড় ও মরুভূমির উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতিবোধ। ফলে তাদের মানবিক অবস্থানের পতন ঘটতে দেরী হয়নি। যার হলাহল আমরা একালে মর্মে মর্মে গলাধকরণ করছি।

নিকট পশ্চিম ও দূর পশ্চিম প্রভাবিত মানসিকতায় যা কিছু জ্ঞান ও সুন্দর তার উদ্ভব হয়েছে পাশ্চাত্যেই। আজকের আত্মবিমুখ জাতি হিসেবে আমরা তাইই সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করছি। এ ধারণা সমর্থন করলে আমাদের নিজেদের যে দার্শনিক ঐতিহ্য আছে তাকে অস্বীকার করা হয়। কারণ নির্মোহ ইতিহাস চেতনা আমাদেরকে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। দার্শনিক পরাধীনতাই যে পাশ্চাত্যমুখী অবস্থান তৈরী করেছে আজ তা অনেকাংশে স্পষ্ট। তাই এটা অনেকের অজানা যে, পাশ্চাত্যে দর্শন যখন হাটি হাটি পা পা করে শৈশব অতিক্রান্ত করছিল তখন এই ভারতীয় উপমহাদেশে দর্শন চর্চা হয়েছিল যৌবনপ্রাপ্ত। মাওলানা আজাদ বলেছেন- “ভারতীয় দর্শন মানব সভ্যতার অন্যতম গর্বের সম্পদ।”

প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে যে সাহসী ব্যক্তিরা প্রথম প্রতিবাদ করেন সেই মহান দর্শন যোদ্ধাদের একজন হলেন ঋষি বৃহস্পতি। তিনি ছিলেন সেকালের একজন দুঃসাহসী চিন্তানায়ক। প্রকৃত জ্ঞান ও প্রগতির পক্ষে তার অবস্থান ছিল অটল ও দৃঢ়। সাম্রাজ্যবাদী দর্শন ও নীতিবোধের বিরুদ্ধে তিনিই সর্বপ্রথম জোর গলায় প্রতিবাদ জানান। এ অঞ্চলের যুক্তিবাদী ও মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের চিন্তানায়কদের আদিগুরু হচ্ছেন ঋষি বৃহস্পতি। ঋগ্বেদে বৃহস্পতি বলেছেন, ‘বস্তুই চরম সত্তা’। মাধবাচার্য এর ‘সর্বদর্শন সংগ্রহ’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বার্হস্পত্য দর্শনের এই উদ্ধৃতি আছে- “স্বর্গ নেই, মোক্ষ নেই, আত্মা নেই, পরলোক নেই, জাতিধর্ম নেই, কর্মফল নেই। ত্রিবেদ, ত্রিদণ্ড এবং ভস্মলেপন এসব বুদ্ধি ও পৌরুষহীন কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় মাত্র (বুদ্ধি পৌরুষহীনানাং জীবিকা, ধাতৃনির্মাতা)।” এই বার্হস্পত্য দর্শনের প্রধান ভাষ্যকার হিসাবে চার্বাক ঋষি ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ খ্যাত ছিলেন। উপমহাদেশের দর্শন পরিমণ্ডলে চার্বাকের দার্শনিক অবস্থানের পরিচিতি ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের যথার্থ কারণ চার্বাকের মত করে আর কেউ বলতে পারেনি। তাই জনজীবনের আত্মিক গঠনে তার দর্শনের ভূমিকা ছিল প্রবল। একারণেই চার্বাকের দর্শনকে বলা হয় ‘লোকায়ত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে, “প্রত্যক্ষ ছাড়া পরোক্ষ কোন প্রমাণ নেই। শরীর থেকে পৃথক কেন চৈতন্য নেই।” তিনি মনে করেন বস্তুই সব কিছু সৃষ্টির মূলে। তিনি বলেন, “মৃত্তিকা, বায়ু, অগ্নি ও জল, এই চারিতত্ত্বের সমাহারে শরীর সৃষ্টি হয়। দেহাতীত কোন আত্মা নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোন বহিঃশক্তির সহায়তা ছাড়া, এমন কি অদৃষ্টেরও সহায়তা ছাড়া নিজে নিজেই সৃষ্ট হয়।” Ethnic Epic রামায়ণেও আমরা এই বস্তুবাদী দর্শনের চিত্র পাই। বনবাসে যাওয়া রাম ছোটভাই ভরতের অনুরোধেও যখন অযোধ্যায় ফিরে যেতে অস্বীকার করেন তখন তাদের সামনে এসে উপস্থিত হন বস্তুবাদী ঋষি জাবালি। তিনি রামকে উপদেশ দিয়েছিলেন- “চতুর লোকের রচিত শাস্ত্রগ্রন্থে আছে যজ্ঞ কর, দান কর, ত্যাগ কর, তপস্যা কর ইত্যাদি। এর উদ্দেশ্য কেবল জনসাধারণকে বশীভূত করা। অতএব হে রাম, তোমার এই বুদ্ধি হোক যে পরলোক নেই। যা প্রত্যক্ষ তার জন্যই উদ্যেগী হও যা পরোক্ষ তা পরিহার কর।”

বৃহস্পতি, চার্বাক এর পরে আমরা ভারতীয় বস্তুবাদীদের মধ্যে দেখা পাই সাংখ্য মতাবলম্বীদের। তারা মনে করতেন কাজ একান্তভাবেই কারণের পরিণাম। কাজের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারেনা যা কারণের মধ্যে অবশ্যই অস্ফুট বা বীজাকারে বর্তমান নয়। তাই তাদের বিশ্বাস যেহেতু ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না অতএব ঈশ্বর নেই। তারা মনে করেন পৃথিবী সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বর ধারণার প্রয়োজন নেই। কোনো কারণ নিজের পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাজের সৃষ্টি করতে পারে না। তাই অপরিবর্তনীয় ঈশ্বর জগতরূপ কাজের কোনো কারণ হতে পারে না। তবে তাদের ধারণার মধ্যে বহু আত্মা সস্পর্কিত ভাবনারও মিশ্রণ রয়েছে। এই নিরাসক্ত উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় বৌদ্ধ মতের। গৌতম বুদ্ধের এই মতের নাম বৌদ্ধধর্ম হলেও এটি প্রচলিত অর্থে কোনো ধর্ম নয়। এটি একটি মতবাদ যা মানুষের জীবনযাত্রাকে অর্থবহ করতে চায়। মহান গৌতম বুদ্ধও মনে করতেন আত্মা বা ঈশ্বর বা এধরণের কোন অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা বাস্তবে নেই। এমন ভাবনার প্রভাব জৈন ধর্মের মধ্যেও কিঞ্চিত রয়েছে। কবীর, দাদু প্রমুখ সংস্কারকদের মতবাদের মধ্যেও অলৌকিকতার তুলনায় মানবীয়তার স্পর্শ খুবই স্পষ্ট। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় গণ্ডীর বাইরে থেকে লোকায়ত মরমীবাদকে আশ্রয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন লালন ফকির সহ বাউল সম্প্রদায়। ভারতীয় উপমহাদেশীয় বস্তুবাদী দর্শনসঞ্চারী মনোভঙ্গিকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন ডক্টর রাধাকৃষ্ণন, মানবেন্দ্র নাথ রায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ প্রাজ্ঞ দার্শনিকেরা।

প্রথাবিরোধী ধর্মদর্শনের প্রাচীন ধারাবাহিকতার বাংলাদেশী রূপকার হলেন আরজ আলি মাতুব্বর। তিনি মনে করতেন পশু যেমন সামান্য জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে ধর্মবাদী ব্যক্তিগণও তেমনি সামান্য জ্ঞান নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। মেধার বিকাশ, মুক্তচিন্তা, মুক্তজ্ঞান, বিজ্ঞান চেতনা ইত্যাদি মুক্তবৌদ্ধিক মনোভঙ্গির বিপক্ষে ধর্মপ্রবণ ব্যক্তিগণ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। তাই ধর্ম অনেকাংশেই মানুষের মানবিক বিকাশকে সমর্থন করে না; মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, উদারতা, সহানুভূতিশীলতা, মানবিকতা প্রভৃতির প্রসার-প্রচারকে অনেকাংশেই সীমিত করে তোলে। তিনি জানেন সমাজের যথার্থ মুক্তি ঘটে একমাত্র বস্তুবাদী দর্শনের চর্চাতেই। নিজের প্রান্তিক জীবনের সাধারণ কয়েকটি ঘটনাতেই তিনি বুঝে নিয়েছেন তার ও তার সমাজের আচরিত ধর্মের স্বরূপ। ক্রমাগত গ্রন্থ পাঠে বুঝে নিয়েছেন এর কারণাবলী। এই অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাই তিনি অনবরত প্রশ্নবাণে দগ্ধ করেছেন তথাকথিত সমাজপিতা ও তাদের আচরিত-প্রচারিত ধর্ম ও দর্শনকে।

ফিলোসফি শব্দটি এসেছে ‘ফিলোসফিয়া’ শব্দটি থেকে। ফিলোসফি শব্দটির ইংরেজি ভাবার্থ ‘জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ’। সংস্কৃত ‘দর্শন’ শব্দটির আপাত অর্থ ইন্দ্রিয়জ ‘দেখা’। কিন্তু যখন ‘বিদ্যা’ অর্থে প্রযুক্ত হয় তখন আর তা চাক্ষুষ দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না। চোখ দিয়ে দেখার সীমাবদ্ধতা পেড়িয়ে দার্শনিকরা যখন শুধু মন নয় বুদ্ধি ও চিন্তা দিয়েও দেখা শুরু করলেন তখন থেকেই ‘দর্শন’ শব্দটি লাভ করলো নতুন অভীধা। দর্শন ও জিজ্ঞাসা মোটেই পরস্পরবিরোধী নয়। বরং শব্দ ও চেতনাদ্বয় সবসময়ই পরস্পরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করেছে। প্রাজ্ঞ পণ্ডিত আরজ আলি মাতুব্বরও অজস্র জিজ্ঞাসায় প্রতিনিয়ত বিক্ষত হয়েছেন। এলোমেলোভাবে উদয় হওয়া প্রশ্নধারা তাকে অকুল চিন্তা সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছিল। তিনি দেখেছেন তাঁর জীবনে বিরক্তির উদ্রেগ করা একাধিক সমস্যার মূলে ছিল তার সমাজে আচরিত ও প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। স্বধর্মের কারণেই তাকে একাধিকবার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। ১৩৫৮ সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বরিশালের ল ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তবলিগ জামাতের আমির এফ রহমান আরজ আলিকে জামাতভুক্ত হবার প্রস্তাব দেন। তিনি সরলমনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-“ধর্মজগতে এরূপ কতগুলি নীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি এবং ঘটনার বিবরণ প্রচলিত আছে, যাহা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে এবং এগুলি দর্শন ও বিজ্ঞানের সাহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে, এমনকি অনেকক্ষেত্রে বিপরীতও বটে। ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিনটি মতবাদের সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে চিন্তা করিতে যাইয়া আমার মনে কতগুলি প্রশ্নের উদয় হইয়াছে এবং হইতেছে। আমি ঐগুলি সমাধানে অক্ষম হইয়া এক বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপে নিমজ্জিত হইয়া আছি। আপনি আমার প্রশ্নগুলির সুষ্ঠু সমাধানপূর্বক আমাকে সেই বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপ হইতে উদ্ধার করিতে পারিলে আমি আপনার জামাতভুক্ত হইতে পারি।” কিন্তু পশ্চাৎপ্রবণ করিম সাহেব এর উত্তর দিয়েছিলেন আরজ আলিকে গ্রেফতার করে। আরজ আলির প্রশ্নের বিপরীতে ঈশ্বরের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করেননি। আদালত তাঁর প্রশ্নগুলোকে অপরাধ মনে করেনি কিন্তু প্রশ্নগুলির ব্যাখ্যা তৈরী করতে গিয়েই রচিত হয়ে যায় ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থটি। গ্রন্থটি যখন ছাপাখানায় ছিল তখন জনৈক পীরের আদেশ এসেছিল এর ছাপানো বন্ধ করতে এবং যা ছাপা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে ফেলতে। চুয়াত্তরের কোনো এক সময় মাদ্রাসার ছাত্ররা হত্যার উদ্দেশ্যে আরজ আলিকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণের এইসব অপচেষ্টা প্রত্যেকবারই মুক্তবুদ্ধির মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বিফল হয়ে গিয়েছিল। ’৭১ এ স্বাধীনতার পর তিনি এবং তার সুহৃদরা পরম বিস্ময় ও আতংকের সাথে দেখছিলেন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পতাকাবাহী দেশটিতে ক্রমাগত সিরাত ও কিরাত মাহফিলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা সগৌরবে উপস্থিত হয় ইসলামী সম্মেলন সংস্থায়। আরজ আলি বিশ্লেষক মুহম্মদ শামসুল হক এর ভাষায়- “ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় জাতীয় নেতার সগৌরব উপস্থিতি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতায় নতুন মাত্রা যোগ করে বুকের ভেতরটায় কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।”

আরজ আলি দেখেছেন দাবীকৃত শান্তিবাদীরাই তার জীবনে যতো অশান্তির মূল। তাই অমানবিকতা, আক্রমণপ্রবণতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কারপ্রবণতা, ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ এসবের বিরুদ্ধে তার নৈতিক অবস্থান অনেকের তুলনায় অনেক দৃঢ় ছিল। ধর্মপ্রাণ মার মৃত্যুর পর আরজ আলি তার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য পেশাদার ফটোগ্রাফার দ্বারা মৃত মায়ের ছবি তুলিয়েছিলেন। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী প্রাণীর ছবি তোলা মহা অপরাধ। বর্তমান কালের ধর্মবাদী ব্যক্তিরা একথা স্বীকার করতে না চাইলেও আরজ আলির মুরুব্বীরা ভণ্ড হতে চাননি। তাই ছবি তোলার অপরাধে মৃত মায়ের সৎকারে তাকে সহায়তা করেননি। ধর্মীয় নীতিবোধের দিক থেকে সমাজনেতারা কোনো ভুল করেননি। কিন্তু অবুঝ আরজ আলি ধর্মীয় বিধানের কঠোর অর্গল মেনে নিতে পারেননি। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে বুঝে নিতে চেয়েছেন মানবতাকে অপমান করার উৎস ও অনুষঙ্গসমূহকে। চেতনার বন্ধ দরজায় অনবরত আঘাত করে তিনি পরিস্কার করতে চেয়েছেন হাজার বছরে জমে ওঠা প্রতিটি শ্যাওলাকে। তার শ্রম বিফলে যায়নি।

সমকালে নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ইচ্ছা আর নিজস্ব নেই। স্বাধীনতা শব্দটি তার অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন ইচ্ছাকৃত পরাধীন থাকতে চায়। মানুষ মনে করে মানুষ নিজে নিজে স্বাধীন থাকতে পারে না। খারাপ কিছু করে ফেলতে পারে। তাই তারা তাদের সমস্ত স্বাধীনতা বিসর্জন দেয় প্রথা, আইন, রাষ্ট্র, নিয়ম, ধর্ম, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির কাছে। তারা মনে করে একমাত্র কঠোর আচরণ বা শাসনই মানুষকে সৎ হিসাবে তৈরী করে। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়’ কবির এই কথাটি সমকালে অপমানিত হয়। বাস্তবে প্রত্যেকেই আজ স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায়।

প্রতিটি দর্শন ভবিষ্যত সম্পর্কে যা বলে তা মূলত স্বপ্ন। প্রতিটি মতবাদ ভবিষ্যত সম্পর্কে যা ভাবে তা কল্পনা। আমাদের কল্পনাগুলি যে সমাজের স্বপ্ন দেখায় তা যেন কত সুদূর। এই সামাজিক উপলব্ধি আমাদের মতো আরজ আলিকেও প্রতিনিয়ত তাড়িত করতো। তিনি বুঝতে পেরেছেন বর্তমান সামাজিক কাঠামোয় সন্তুষ্ট থাকা চলে না। কারণ সমকালীন সমাজে মানুষ আর মানুষী রূপ ধরে বেঁচে নেই। তারা নির্ধারিত জীবন কাঠামোয় অনবরত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এই আরোপিত যান্ত্রিকতা ভাঙতে হবে। মানুষকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার সত্যিকার জীবনচেতনার সরল অংকটি। তাই তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। সমাজনেতা, ধর্মনেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন অসংখ্য সমস্যার যৌক্তিক সমাধান। ‘আমি কে?’, ‘আমি কি স্বাধীন?’ ‘অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে?’, ‘আল্লাহর রূপ কি?’, ‘ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’, আল্ল¬াহ ন্যায়বান না দয়ালু?’, ‘আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে কি?’, ‘সৃষ্টি যুগের পূর্বে কোন যুগ?’, ‘ঈশ্বর কি দয়াময়?’, ‘জীবসৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?’ ‘পাপ-পূণ্যের ডায়রী কেন?’, ‘পরলোকের সুখ-দুঃখ শারীরিক না আধ্যাত্মিক?’, ‘গোর আজাব কি ন্যায়সঙ্গত?’, ‘ইহকাল ও পরকালে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আল্লাহ মানুষের পরিবর্তন না করিয়া হেদায়েতের ঝঞ্ঝাট পোহান কেন?’, ‘উপাসনার সময় নির্দিষ্ট কেন?’, ‘নাপাক বস্তু কি আল্লাহর কাছেও নাপাক?’, ‘উপাসনায় দিগনির্ণয় কেন?’, ‘মেয়ারাজ কি সত্য না স্বপ্ন?’, ‘ইসলামের সহিত পৌত্তলিকতার সাদৃশ্য কেন?’, ‘জীবহত্যায় পূণ্য কি?’, ‘মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আকাশ কি?’, ‘দিবা-রাত্রির কারণ কি?’, ‘বজ্রপাত হয় কেন?’, ‘রাত্রে সূর্য কোথায় থাকে?’, ‘আদম কি আদি মানব?’, ‘হজরত মুসা সীনয় পর্বতে কি দেখিয়াছিলেন?’, ‘হজরত সোলায়মানের হেকমত না কেরামত?’, ‘যীশু খ্রীস্টের পিতা কে?’, ‘জ্বীন জাতি কোথায়?’, ‘স্ত্রী ত্যাগ ও হিলা প্রথার তাৎপর্য কি?’ ধর্ম ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে এসব প্রশ্ন সহজাত। একজন প্রশ্নপ্রবণ, যুক্তিবাদী, শিক্ষিত, মানবিক ও উদার ব্যক্তির মনে এসব প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সময়, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ আইন মানুষের এইসব সাধারণ কৌতুহলকে কঠোরভাবে দমন করতে চায়। রাষ্ট্র যেন মানুষের মানবিক রূপের চাইতে স্বাধীনতাহীন যান্ত্রিক রূপটিকেই অধিকতর সমর্থন করে। তাই আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। আমাদের দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করা উচিত কোন দর্শন সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়েছে আর কোন দর্শন সচেষ্ট থেকেছে সামাজিক পরিবর্তনকে বিঘ্নিত করতে।

তিনি জানেন সমস্যাটা কোথায়? তাই কিছু সচেতন উপলব্ধিও তাঁর ছিল। যে পশ্চাৎপদ সামাজিক সিদ্ধান্ত তাঁকে বিরক্ত করতো তার প্রতিও তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি বলেছেন- “মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মিটাইতেছে বিজ্ঞান। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণে অমত করেন, তাহা হইলে আকাশের দিকে তাকান, ঘড়ির দিকে নয়। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণ করিতে না চাহেন, তাহা হইলে যানবাহনে বিদেশ সফর ও জামা-কাপড় ত্যাগ করুন এবং কাগজ-কলমের ব্যবহার ও পুস্তক পড়া ত্যাগ করিয়া মুখস্থ শিক্ষা শুরু করুন। ইহার কোনটি করা আপনার পক্ষে সম্ভব? বোধহয় একটিও না। কেননা মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বিজ্ঞানের দান অনস্বীকার্য। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন হইতে শুরু করিয়া দেশলাই ও সুচ সুতা পর্যন্ত সবই বিজ্ঞানের দান। বিজ্ঞানের কোন দান গ্রহণ না করিয়া মানুষের এক মুহূর্তও চলে না। মানুষ বিজ্ঞানের কাছে ঋণী। কিন্তু সমাজে এমন একশ্রেণীর লোক দেখিতে পাওয়া যায়, যাঁহারা হাতে ঘড়ি ও চক্ষে চশমা আঁটিয়া মাইকে বক্তৃতা করেন আর ‘বস্তুবাদ’ বলিয়া বিজ্ঞানকে ঘৃণা ও ‘বস্তুবাদী’ বলিয়া বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞা করেন। অথচ তাঁহারা ভাবিয়া দেখেন না যে, ভাববাদীরা বস্তুবাদীদের পোষ্য। বিজ্ঞান মানুষকে পালন করে। কিন্তু ধর্ম মানুষকে পালন করে না, বরং মানুষ ধর্মকে পালন করে এবং প্রতিপালনও।” তিনি তাঁর ‘অনুমান’ গ্রন্থের ‘রাবণের প্রতিভা’, ‘ফেরাউনের কীর্তি’, ‘ভগবানের মৃত্যু’, ‘আধুনিক দেবতত্ত্ব’, ‘মেরাজ’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ প্রভৃতি প্রবন্ধে অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞানপ্রবণ মন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন আমাদের বিশ্বাসের স্বরূপ। তিনি দেখিয়েছেন আমাদের চিন্তার যৌক্তিক অসারতা। ‘সৃষ্টি রহস্য’ গ্রন্থে মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সারা পৃথিবীতে প্রচলিত একাধিক সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। তিনি বুঝেছেন সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চৈনিক মত, মিশরীয় মত, ফিনিসীয় মত, ব্যাবিলনীয় মত, অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকা-আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের মত, পলিনেশীয় মত, বৈদিক ধর্ম, পার্সি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টিয় ধর্ম, ইসলাম ধর্ম প্রভৃতির মত পরস্পরের চাইতে আলাদা। সেমেটিক ধর্মগুলোর (ইহুদি, খ্রিস্টিয়, ইসলাম) সৃষ্টিতত্ত্ব প্রায় একই হলেও পরবর্তী ধর্মটি পূর্ববর্তীর তুলনায় নিজেরটাই সঠিক বলে ভেবেছে এবং পূববর্তী ধর্ম সম্পর্কে নিন্দামুখী ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। দার্শনিক মতের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কেও তাঁর কৌতুহল ছিল। থেলিস, অ্যানাক্সিমান্ডার, পিথাগোরাস, জেনোফেনস, হিরাক্লিটাস, এরিস্টটল, এম্পিডোকলস, অ্যানাক্সাগোরাস, ডেমক্রিটাস, লিউকিপ্পাস, সক্রেটিস, প্লে¬টো, অ্যারিস্টটল প্রমূখ প্রদত্ত সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধেও তাঁর সচেতন জ্ঞানপিপাসা ছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন তিনি। তারপরও দাবিকৃত শিক্ষিতজনদের চাইতে তিনি অনেক বেশি শিক্ষিত ছিলেন। মননশীলতার অসাধারণ সৌকর্যছটায় আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন যে প্রশ্নধারা তা আজ মহাসত্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিতে অশিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষায়, প্রজ্ঞায়, মননে, বুদ্ধিবৃত্তিতে বাঙালি জাতির উজ্জ্বল এই নক্ষত্রটির নাম আরজ আলি মাতুব্বর। বাংলা ১৩৯২ সালের ৩ পৌষ জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি অর্থকষ্টে ভুগেছেন সারাজীবন। তারপরও গ্রন্থের সংস্পর্শ থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত দূরে থাকেননি। তিনি জন্ম নিয়েছেন বরিশাল শহর থেকে ছয় মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে লামচরি নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় ছিলনা। তাই মুন্সি তাহের আলীর মক্তবে আরজ আলির শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মুন্সি আব্দুল করিম, মুন্সি আফছার উদ্দিন প্রমূখের কাছে কোরানীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাতে আরজ আলির জ্ঞানতৃষ্ণা মেটেনি। অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও আর তাঁর জীবনে ঘটেনি। নিজের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘আজীবন পল্লীবাসী’, পেশায় ‘খাঁটি কৃষক’, জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাঁর ‘সহচর ছিল গরু’। তিনি ছিলেন ‘ইংরেজী ভাষায় অদ্বিতীয় মূর্খ’, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল ‘সেকালের পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী’ পর্যন্ত। সেই তিনিই নিজের ভিতরে লালন করেছেন একটি চিরপ্রজ্জ্বল দীপশিখা যার নাম ‘মুক্তবুদ্ধি’।

একা একাই তিনি অন্যদের ফেলে দেয়া বই, ছেঁড়া কাগজ, বাজারের ঠোঙা পড়ে পড়ে বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে শিখেছেন ভূগোল, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, ব্যাকরণ। ইসলামের গন্ডী পেরিয়ে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, মনসামঙ্গল, মনুসংহিতা পড়েছেন, লাভ করেছেন সনাতন ধর্ম সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান। ক্রমাগত মানসিক দিগন্ত প্রসারিত করার এক অদম্য নেশায় পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তাঁর কৌতুহলী মনের সামনে সব সময়ই একটি প্রশ্ন ‘কেন’ তাকে দাঁড় করিয়েছে এক মহাকালিক সমাধানের সামনে।

মৃত মায়ের ছবি তোলার কারণে যে সময়ে ধর্ম ও সমাজনেতাদের কাছে তিনি অপরাধী সাব্যাস্ত হন সেসময় তিনি স্বপাঠ প্রক্রিয়ায় দশম শ্রেণীর পাঠ্যবই পড়ছিলেন। সমসাময়িক সময়েই তিনি দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, শীত-গ্রীষ্ম, বজ্র-বৃষ্টি, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে করতেই যুক্তিবাদী হয়ে উঠছিলেন। প্রায় প্রতিটি বিষয়েই প্রশ্ন করা এবং তার বিজ্ঞান সম্মত উত্তর খোঁজা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। মৃত মায়ের ফটো তোলা কেন্দ্রিক ঘটনায় তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন দৃষ্টি ফেরালো ধর্মের দিকে। এবার তিনি সচেতনভাবে শুরু করলেন বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থপাঠ। অসংখ্য দার্শনিক প্রশ্ন তাঁকে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিল।

প্রচলিত অর্থে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। কিন্তু অনেক শিক্ষিতজনের চাইতেও তাঁর দৃষ্টি স্বচ্ছ ও গভীর ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানগর্বী আমাদের মননে আঘাত করে অশিক্ষিত(?) আরজ আলি মাতুব্বর দেখিয়ে দিয়েছেন মুক্তবুদ্ধি কিংবা যুক্তিবাদী হওয়ার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী হওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তাই তিনি বুঝেছেন, “শাহ ছাহেবদের ‘কালাম’এর তাবিজে কৃমি পড়ে না, কৃমি পড়ে স্যান্টোনাইন সেবনে। মানত-সিন্নিতে জ্বর ফেরে না, জ্বর ফেরাইতে সেবন করিতে হয় কুইনাইন। লোকে বিশ্বাস করিবে কোনটি? নানাবিধ রোগারোগ্যের জন্য পীরের দরগাহ হইতে হাসপাতালকেই লোকে বিশ্বাস করে বেশি। গর্ভিনীর সন্তান প্রসব যখন অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে, তখন পানিপড়ার চেয়ে লোকে বেবী ক্লিনিকের (Baby Clinic) উপর ভরসা রাখে বেশী।” এই সচেতন অনুভূতির জন্য তাঁকে ভুগতেও হয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণ তাঁকে তাড়া করেছে জীবনভর। তবুও তিনি নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে যা বুঝেছেন তার পক্ষে নিজ অবস্থান অনড় রেখেছেন।

প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা তিনি পাননি। তারপরও তিনি তাঁত, ডায়নামো, জলঘড়ি, জলকল প্রভৃতি যন্ত্র তৈরী করতে পেরেছিলেন। ‘সীজের ফুল’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মনীষা ও প্রজ্ঞার চরম প্রকাশ ঘটেছে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘অনুমান’, ‘আমার জীবন দর্শন’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলিতে। এই গ্রন্থগুলিতেই তিনি কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে এক মৌনবিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। অন্যদের মত চীৎকার করে নয়; তাঁর স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যে, বিনম্র, ধীর, শান্ত ও যুক্তিবাদী ভঙ্গীতে।

তিনি দেখেছেন আমাদের সমাজের মানুষেরা চিন্তায় স্থবির, জিজ্ঞাসাবিমুখ। তাঁরা হাজার বছর অতীতের বৈদেশিক নিয়মনীতিকেই সঠিক মনে করে। স্বদেশী চেতনা, মর্মবোধ, নীতি, সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁরা পোষণ করে এক অজ্ঞ বিমুখতা। এটা যে কুসংস্কার প্রবণতার ফল সে সম্বন্ধে আরজ আলি মাতুব্বরের কোন সন্দেহ ছিল না। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে তিনি বুঝে নিয়েছেন এই সামগ্রিক স্ববিরোধীতার উৎসসমূহ।

প্রচলিত অর্থে তিনি নতুন কোন দার্শনিক তত্ত্বের সৃষ্টি করেননি। কোন মৌলিক তত্ত্ব উদ্ভাবনের চেষ্টাও তিনি করেননি। কিন্তু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিযে দেখিয়ে দিয়েছেন কোন দার্শনিক মতকে কিভাবে গ্রহণ করতে হয়, কোনটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত, কোনটি তুলনামূলকভাবে মানবীয়, কোনটি সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানচেতনাসম্পন্ন। তিনি এ সমাজের অজ্ঞান মানুষদের বৌদ্ধিক পুষ্টির অভাব দূর করতে চেয়েছিলেন। তাই শুধু প্রশ্নই করেননি। প্রশ্নের পাশাপাশি তাঁর প্রশ্ন করার কারণ, পদ্ধতি, বিশ্লেষন ও সমাধানের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি তাঁর সচেতন অর্থাৎ যুক্তিপ্রবণ মন দিয়ে যা দেখেছেন, মনে করেছেন, বুঝেছেন তা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী মতগুলোর তুলনাও করেছেন কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত দেননি। সমস্ত তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরে প্রত্যাশা করেছেন পাঠকের বুদ্ধিপ্রভাবিত আলোকিত চিন্তার। কামনা করেছেন সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণের মর্মদীপ্ত উপলব্ধির।

আরজ আলি মাতুব্বর এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছেন যে সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপ্রবণ, কুসংস্কারমুখী ও বৈদেশিক নীতির আফিমে আচ্ছন্ন। প্রতিভাবিমুখ এ সমাজে তাই আরজ আলিকে আমরা চিনিনা বা চিনলেও তাঁর সম্পর্কে পোষণ করি এক কুসংস্কার প্রভাবিত সংস্কার। মধ্যযুগে ফ্রান্সিস বেকন ইউরোপে জন্ম নিয়ে জন্ম দিয়েছেন আধুনিক যুগের। ইউরোপ তাঁকে রেনেসাঁসের অগ্রদূত বলে সম্মানীত করেছে। পণ্ডিতম্মন্য আমরা আরজ আলিকে না চিনলেও পাশ্চাত্যের আলোকিত সমাজ তাঁকে চিনতে ভুল করেনি। তাই যে সময়ে আরজ আলি তাঁর স্বদেশে প্রায় অজ্ঞাত বা নিষিদ্ধ সেই সময়ে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের ‘Iconoclast’ পত্রিকা লিখেছে Aroj ali, ‘The insurrectionist’, দিয়েছে সক্রেটিসের মর্যাদা।

Read More ...

Saturday, February 23, 2008

দুপুরের ঘুম

বিবিসির সাম্প্রতিক খবরে জানা গেছে অফিসে কাজের সময় বা বাসায় বসে টিভি দেখার সময় অনেককে ঝিমোতে দেখা যায়। কেউ কেউ আবার খাবার সময়ও ঝিমান। ব্যাপারটি সাধারণ মনে হলেও আসলে বিপজ্জনক। মার্কিন গবেষকরা জানিয়েছেন, দিনের বেলায় যারা নিয়মিত ঝিমান তাদের দ্রুত স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। যারা দিনের বেলায় কখনও ঝিমান না বা ঘুমান না তাদের চেয়ে যারা ঝিমান তাদের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দুই থেকে চারগুণ বেশি। তাই গবেষকরা ডাক্তারদের পরামর্শ দিযেছেন তাদের রোগীরা টিভি দেখার সময় ঝিমান কিনা পরীক্ষা করে দেখতে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকে কথা বলার সময় এবং ট্রাফিক জ্যামের সময় ড্রাইভিং সিটে বসে ঝিমান। এই ঝিমানোর অভ্যাস খুবই মারাত্মক বলে তারা মন্তব্য করেন। রাতের বেলা ঘুমানোর সময় অনেকের নি:শ্বাস কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
এই লক্ষণকে চিকিৎসকরা বলেন এপনিয়া। তাদেরও স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাতের বেলা পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এ ধরণের লক্ষণ দেখা যায় বলে মন্তব্য করলেন তারা। আর এই লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায় বয়স্কদের মাঝে।
Read More ...

Thursday, February 21, 2008

অতিথি নয় পরিযায়ী

উপরের পাখির ছবিগুলো ড. রেজা খান এর তোলা।

কয়েকদিন আগে প্রথমে আলোতে পরিযায়ী পাখি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ড. রেজা খান এর একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির চুম্বক অংশ এখানে প্রকাশ করলাম।

পরিযায়ী পাখিরা বিদেশি পাখিনয়
ড. রেজা খান
(দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধান)

পরিযায়ী পাখির ইংরেজি শব্দ হল মাইগ্রেটরি বার্ড। প্রাণীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেশন এর সঠিক অর্থ সাংবাৎসরিক পরিযায়ন। তাই মাইগ্রেটরি পাখির বাংলা হবে পরিযায়ী পাখি। প্রত্যেক বছর এই পাখিগুলো বৎসরের কোন বিশেষ ঋতুতে পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যায়। ঋতুশেষে আবার প্রথম অঞ্চলে ফিরে আসে। শুধু পাখি নয় কিছু প্রজাতির প্রজাপতি, হাঙর, মাছ, স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে বাদুড়, চামচিকা, জেব্রা, গেজেল, ওয়াইল্ড বিস্ট, তিমি ও ডলফিনও পরিযায়ন করে।

পরিযায়ী পাখিরা তাদের সাংবৎসরিক যাতায়াত মূলত প্রজননকালীন অঞ্চল, যেমনসাইবেরিয়া এবং অন্য শীতকালীন অঞ্চল, যেমনসিলেটের হাওড় এলাকায় সীমিত রাখেপরিযায়ী পাখিরা নির্দিষ্ট একটি এলাকায় সব সময় না-ও যেতে পারেযেমনসিলেটের হাওরে না এসে চলে যেতে পারে; ধারেকাছের ভারতীয় এলাকা বা মিয়ানমারেও
ধরুন, বামন চা পাখি বা লিট্ল স্টিন্ট সাইবেরিয়ায় প্রজননের পরপর অক্টোবরে দক্ষিণের দিকে ওড়া শুরু করেএদের একটি দল চীন, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, ভারত হয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশের নানা এলাকায়অন্য দল চলে যায় রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল ও চীন হয়ে জাপানের দিকেএদের আরেক দল ছোটে পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে, সেখান থেকে আফ্রিকার দিকেধারণা করা হয়, এদের কিছু অংশ ভারত হয়ে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যাত্রা করে বাংলাদেশ পেরিয়ে যায়
পরিযায়ী পাখিরা প্রধানত শীতের সময় এলেও অনেকে এ দেশে আসে বসন্ত ও শরৎকালেঅনেকে এ দেশে আসে কেবলই গ্রীষ্মশীতকালে পরিযায়ী পাখি বেশি চোখে পড়ে বলে সবাই এদের শীতের পাখি বলে ডাকে এই ভুল সম্বোধন পরিহার করা দরকার

পরিযায়ীদের নামবিভ্রান্তি
পাখি সম্পর্কে অজ্ঞানতার ফলে অনেকে পরিযায়ী পাখিদের অতিথি পাখি’, ‘মেহমান পাখিবা বিদেশি পাখিবলে আখ্যায়িত করছেনঅজ্ঞানতা এত দুর গেছে যে এক সাবেক প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী অতিথি পাখিরা কারও নিমন্ত্রণে আসেনি বলে সেগুলোকে মেরে খাওয়ার আহ্বান জানান(!)
পরিযায়ী পাখি বলতে বাংলাদেশে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় কেবল শীতকালে আসা হাঁস ও রাজহাঁসকেসাধারণ মানুষ শীতকালে জনপথে বিক্রি হওয়া কালিম, ডাহুক, কোড়া ও সরালী পাখিকেও শীতের পাখি মনে করেঅথচ এসব পাখি আমাদের দেশের বাসিন্দা বা রেসিডেন্ট প্রজাতিদেশে আবাসস্থলের অভাব হওয়ায় এরা এখন বেশির ভাগ সময় পাশের দেশ ভারত ও মিয়ানমারে কাটায়শীতকালে এরা সেখান থেকে আমাদের জলাভূমিতে নেমে আসেএদের কিছু নমুনা এখনো বাংলাদেশে প্রজনন করে

পরিযায়ী নানা পাখি
গুটিকয় চিল, শকুন ও বাজ বাদ দিলে আমাদের দিবাভাগের অনেক শিকারি পাখিই পরিযায়ী এদের মূল দল বাংলাদেশ পাড়ি দেয় শীতেমোহনা, হাওর অঞ্চল ও হাওরের বৃহত্তম ইগল (ইম্পেরিয়াল ইগল), বড় ও ছোট চিত্রা ইগল (গ্রেটার ও লেসার স্পটেড ইগল), বাদামি বা খয়েরি ইগল (স্টেপি ও টওনি ইগল) ও মেছো ইগল বা অস্প্রে দেখা যায় বেশ ; অন্যত্র ডোরাবুক ভুবনচিল (লাইনিয়েটেড কাইট), কাটুয়া চিল (বুটেড ইগল), বোনেলির ইগল (বোনেল্লিস ইগল), জলার চিল ও রাখালভুলানি (হ্যারিয়ার), কালো শকুন (সিনেরিয়াস বা ব্ল্যাক ভালচার), তুরমুতি ও শাহিন (ফ্যালকনস) ইত্যাদিনিশাচর শিকারি পাখির মধ্যে পেঁচারও কয়েকটি প্রজাতি পরিযায়ী
বড় বড় জলাশয়, হাওর, চর, মোহনা, উপকুলীয় এলাকা ও দ্বীপাঞ্চলে হাজারে হাজারে আসত জলকবুতর, গঙ্গাকইতর, বদর বা বদরশাহর কবুতর ও গাঙচিলসমুদ্রসীমানায় কোনো জেলেপল্লী মানেই ছিল শত শত গঙ্গাকইতরের ভিড়জেলে নৌকা আর ট্রলারগুলোর পিছু নিত অসংখ্য গাঙচিলশীতের প্রধান জলচর প্রজাতিগুলো হলো গঙ্গাকইতর বা বদর (ব্রাউনহেডেড গাল), কালোমাথা গঙ্গাকইতর (ব্ল্যাকহেডেড গাল), জলকবুতর (ইয়েলোলেগ্ড গাল) ও বড় জলকবুতর (প্যালাসেস গাল)সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গঙ্গাকইতরঢাকার বুড়িগঙ্গায় এদের দেখা যায় বেশএর পরপর আছে জলকবুতর
শরৎ বা বসন্তেও এ দুই প্রজাতিকে মোহনা অঞ্চলে ক্বচিৎ দেখা যেতে পারেজলকবুতর বা গঙ্গাকইতরের কোনো প্রজাতি আমাদের সীমানায় প্রজনন করে নাগাঙচিলের কিছু প্রজাতি এখনো প্রজনন করেকিছু প্রজাতি আগে করত, এখন আর করে না
খোঁপাযুক্ত মাঝারি গাঙচিল (লেসার ক্রেস্টেড টার্ন), খোঁপাযুক্ত বৃহৎ গাঙচিল (গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন) ও বৃহৎ গাঙচিল (ক্যাস্পিয়ান টার্ন) দেখা যায় শুধু উপকুলীয় এলাকায়; মাঝারি গাঙচিল (কমন টার্ন) ও বড়ঠোঁটি গাঙচিল (গালবিল্ড টার্ন) বড় বড় জলাশয়েএরা সবাই আসে শীতে
বক, কোদালি বক, কাস্তেচরা, সারস, হাড়গিলা, মদনটাক, শামুকখোল ইত্যাদির লম্বা লম্বা পা, গলা আর ঠোঁট এদের বলা হয় ওয়েডিং বার্ডস, পানি কেটে বা ভেঙে চলা পাখিএদের মধ্যে পরিযায়ীর দলে পড়ে কোদালি বা খুন্তেবক (স্পুনবিল), কাস্তেচরার (আইবিস) দু-একটি প্রজাতি, সারসের (স্টর্ক) সব কয়টি প্রজাতি এবং মোহনা ও জলাভুমিতে দেখতে পাওয়া ধুসর বক (গ্রে হেরন)পরিযায়ী কাস্তেচরা ও সারস বিরল; বাকিরা সুলভ


প্রজননকারী পরিযায়ী
চাতক, পাপিয়া, সরগম, লালপাখা কোকিল, রঙিলা চ্যাগা, ঘুরঘুর খায়েরি ও সুমচার দলকে আমরা বিবেচনা করতে পারি প্রজননকারী পরিযায়ী পাখি হিসেবেএরা আমাদের দেশে আসে এপ্রিল-মে থেকে জুলাই-আগস্টেএদের মধ্যে প্রথম চারটি কোকিলগোত্রীয় এবং সব কয়টিই বাসা-পরজীবীঅর্থাৎ এরা নিজেরা বাসা বানায় না, অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়েসে বাসার পালক পাখি মা-বাবা ডিমে তা দেয়ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে নিজের বাচ্চা ভেবে কোকিলছানাদের খাইয়ে বড় করেবাচ্চা বড় হয়ে নিজের রূপ ধারণ করলে পালক মা-বাবা তাদের তাড়িয়ে দেয়পাখিরা তত দিনে মিয়ানমার বা ভারতে উড়ে যেতে সক্ষম হয়ে উঠেছে ঘটনা সাংবৎসরিকএসব কোকিল তাই পরিযায়ী পাখিআমাদের অতি পরিচিত কালো কোকিল, চোখ গেল, সরগম ও বউ-কথা-কও পাখি স্থানীয় প্রজাতি

আরও কত পাখি
আমরা সচরাচর দেখি না এমন অসংখ্য পরিযায়ী পাখি শরতের শেষে আসতে শুরু করেভরা শীতে তাদের আগমন তুঙ্গে ওঠে, ভাটা পড়ে বসন্তেএ দলে প্রধান হলো খঞ্জনি বা ওয়াগটেইল, তুলিকা বা পিপিট, কসাইপাখি বা শ্রাইখ, ফুটকি বা পাতাফটুকি, লিফ ওয়ার্বলার, চটক বা ফ্লাইক্যাচার, বঘেরি, মাঠচড়াই, ধুলচড়াই বা বান্টিং, ফিনচেস ও লার্কসদেশের যেকোনো বাগবাগিচা, উঠানের কামিনী, জবা, পাতাবাহার, জুঁই, গন্ধরাজ, গোলাপ, বাগানবিলাস, কাঠগোলাপ এবং অন্যান্য ফুল-ফলগাছের ওপর দিয়ে ও ক্ষেতখামার মাড়িয়ে চলে যায় এরাএরা আকারে ছোট, বেশির ভাগই বাবুই-চড়ুই পাখির মতোরং বাহারি নয় বলে আমাদের চোখেই পড়ে নাতাই ঝাঁকে ঝাঁকে আসা এসব পরিযায়ী পাখি আমাদের তালিকায়ও ঠাঁই পায় না
এসব পাখির একটিকেও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিনদেশী বা অতিথি পাখি বলা যাবে নাকারণ, এরা আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থার অচ্ছেদ্য অংশশীত, গ্রীষ্ম, শরৎ ও হেমন্তে আমাদের ভূখন্ড এদের পাড়ি দিতেই হবেসময়মতো এরা ফিবছর আমাদের এখানে আসবে, সময়মতো চলেও যাবে

এবারের শীতের পরিযায়ী
সিডরের অপ্রত্যাশিত হামলার কারণে এবার শীতে যে শতসহস্র পরিযায়ী পাখি আমাদের হাওর, বাঁওড়, বিল, চরাঞ্চল, মোহনা ও কাপ্তাই হ্রদে এসেছে; তাদের খবর ফিবছরের মতো মিডিয়ায় তেমন জায়গা করে নিতে পারেনিসামান্য খবর যা হয়েছে, তার সবই প্রায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা সরালী হাঁস এবং একটি হাওরে পরিবেশ বিভাগের শীতকালীন পাখি গণনা নিয়ে
সচরাচর দেখা প্রজাতিগুলোর মধ্যে ঢাকার আশপাশের বিল, দিঘি বা হ্রদের প্রায় ৯০ শতাংশই সরালী, গেছোহাঁস বা লেসার হুস্টিলিং ডাক বা ট্রি ডাকসঙ্গে আছে দু-চারটি বড় সরালী বা ফুলভাস বা গ্রেটার হুস্টিলিং ডাক, চখাচখি, দু-একটি লেন্জা (পিনটেইল), বামুনিয়া হাঁস (কমন পোচারড), ভুতিহাঁস (ফেরুজিনাস ডাক), বড় ভুতিহাঁস (বেয়ারসস পোচারড), কালো হাঁস (টাফটেড ডাক), জিরিয়া হাঁস (গারগেনি), পিয়ং হাঁস (গ্যাডওয়াল), লালশির (উইজিয়ন), নীলশির (ম্যালারড), পাতারি হাঁস (কমন টিল), পান্তামুখী বা খুন্তেহাঁস (শোভেলার) ইত্যাদি

সরালী বাদে বাকিগুলো পরিযায়ী পাখিএরা আমাদের মিঠা ও লোনা পানির জলাভুমিতে আসেচলে যায় নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যেতিন-চার প্রজাতির রাজহাঁস আসে কেবল শীতে; বড় বড় নদীর চরে, মোহনায়, হাওরে, কাপ্তাই হ্রদেশাচকার একটি বড় দল দেখা যায় দেশের মোহনা ও উপকুলীয় এলাকায়ভুতিহাঁস, পিয়ং হাঁস, লালশির, বড় ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা খুন্তেহাঁস, চখাচখির বড় দল দেখা যায় বড় বড় হাওর, কাপ্তাই হ্রদ ও বড় নদীতেবোঁচা বা ঘড়যুক্ত হাঁস (কোম্ব ডাক) মূলত স্থানীয় পাখির প্রজাতি প্রজননের পরিবেশ লোপ পাওয়ায় এদের সংখ্যা এত কমেছে যে এরা এখন পরিযায়ীর দলে পড়েদেখাও যায় শীতের সময়ই বেশি
হাঁস, সরালী, রাজহাঁস, চখাচখি বাদ দিলে আর যে বড় পাখির দলটি শীতকালে আমাদের পানিবহুল অঞ্চল দিয়ে যায় বা ওখানে কিছু সময় থাকে, ওদের আমরা জলচর বা জলাভুমির পাখি হিসেবে জানি স্থানীয়ভাবে এদের পরিচয় চা-পাখি (স্যান্ডপাইপার স্টিন্ট), ঢেঙ্গা (শ্যাংক, স্টিল্ট), গুলিন্দা (কারলিউ), বাটান (প্লোভার), জৌরালি (গডউইট), জোয়ালা (রাফ অ্যান্ড রিভ), কাদাখোঁচা (স্মাইপ) এবং হট-টি-টি (ল্যাপউইং) হাঁস বা রাজহাঁস দেখা যাক বা না যাক, জলাভুমির পাখির কিছু নমুনাবিশেষ করে চা-পাখি, খঞ্জনি ও কসাই পাখিদেখা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পুকুর, থানচি, বান্দরবানের গির্জার ছোট্ট চৌবাচ্চায়
সবার কাছে তাই আবেদন, শীতকালে দেখা বা বিভিন্ন ঋতুতে স্বল্প থেকে দীর্ঘ সময়জুড়ে বাংলাদেশে ঠাঁই নেওয়া পাখিগুলোকে অতিথি পাখি, শীতের পাখি বা বিদেশি পাখি বলে আখ্যায়িত করে তাদের যেন আমরা পর করে না ফেলিএরা শীত, বসন্ত, শরৎ বা গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখিএ দেশেরই পরিযায়ী পাখি, এ দেশের প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণচক্রের অচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের জাতীয় প্রাকৃতিক বন্যপ্রাণী-সম্পদের এক বড় হিস্যা

Read More ...